একটা ছোট বাটন চাপলেই কথা বলা যায়, পাঠানো যায় খুদে বার্তা। দামও এক হাজার টাকার কম। ইন্টারনেট বা আধুনিক কোনো সুবিধা না থাকলেও যোগাযোগের জন্য এমন ফোনই ভরসা বহু মানুষের।
বিশেষ করে বয়স্ক, স্বল্প আয়ের ও প্রযুক্তি ব্যবহারে অভ্যস্ত নন—এমন গ্রাহকদের কাছে টুজি নেটওয়ার্কের বাটনফোনের গুরুত্ব এখনও অনেক। কিন্তু দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বদলে যেতে পারে এই চিত্র। ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে টুজি সেবা বন্ধের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন—বিটিআরসি। এতে সরাসরি ফোরজি নেটওয়ার্কে যেতে হবে প্রায় ছয় কোটি টুজি ফোন ব্যবহারকারীকে। প্রশ্ন উঠেছে, বাড়তি খরচের চাপ সামলে এত বিপুলসংখ্যক গ্রাহক কীভাবে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নেবেন।
বিটিআরসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের পর থেকে নতুন কোনো টুজি ফোনের মডেলের অনুমোদন দেওয়া হবে না। ২০২৭ সালের ৩১ মার্চের পর দেশে টুজি ফোন উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই বছরের জুনের পর বন্ধ হবে এসব ফোনের বিক্রি। এরপর ২০২৯ সালের ডিসেম্বরে গ্রাহক পর্যায়ে টুজি সেবা বন্ধ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য মোবাইল নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়ানো ও তরঙ্গের ব্যবহার আরও কার্যকর করা। টুজি সেবায় ব্যবহৃত তরঙ্গ ফোরজি নেটওয়ার্কে কাজে লাগানো গেলে উন্নত হবে তথ্য আদান-প্রদানের সক্ষমতা। পাশাপাশি পুরোনো নেটওয়ার্ক পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
মোবাইল অপারেটর বাংলালিংক ও রবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও টুজি থেকে ফোরজি নেটওয়ার্কে স্থানান্তরের পক্ষে মত দিয়েছেন।
তাদের মতে, ফোরজি সেবায় তরঙ্গের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে তথ্য আদান-প্রদানের সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে।
বাংলালিংকের প্রধান করপোরেট ও নিয়ন্ত্রকবিষয়ক কর্মকর্তা তৈমুর রহমান বলেন, টুজি সেবা বন্ধ করে ফোরজিতে স্থানান্তর করা গেলে তরঙ্গের ব্যবহার আরও দক্ষ হবে। যত দ্রুত পুরোনো নেটওয়ার্ক বন্ধ করা যাবে, ততই অপারেটরের জন্য সুবিধা হবে। কারণ তাদের নেটওয়ার্ক মূলত তথ্য আদান-প্রদানের উপযোগী করে সাজানো হয়েছে। এখন কেবল কথোপকথনের জন্য আলাদা নেটওয়ার্ক রাখা ঐচ্ছিক হয়ে উঠেছে।
তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে সাধারণ গ্রাহকদের সক্ষমতা। দেশে ফাইভজি প্রযুক্তির দিকে অগ্রযাত্রা চললেও ছয় কোটির বেশি মানুষ এখনও টুজি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছেন। এমনকি স্মার্টফোন থাকা সত্ত্বেও সহজে কথা বলা ও দীর্ঘ সময় ফোন ব্যবহারের সুবিধার জন্য অনেকে আলাদা বাটনফোন ব্যবহার করেন।
কম দাম, সহজ ব্যবহার ও দীর্ঘস্থায়ী ব্যাটারির কারণে টুজি ফোন এখনও অনেকের কাছে প্রয়োজনীয় যোগাযোগের মাধ্যম। ফলে এই সেবা বন্ধ হলে শুধু নতুন ফোন কেনার খরচই নয়, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে অভ্যস্ত হওয়ার চ্যালেঞ্জও সামনে আসবে।
কম আয়ের মানুষের জন্য বিকল্প হিসেবে পাঁচ হাজার টাকা দামের স্মার্টফোন বাজারে আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিগগিরই এ ধরনের ফোন বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রান্তিক পর্যায়ের অনেক গ্রাহকের জন্য পাঁচ হাজার টাকাও বড় অঙ্কের ব্যয়। তাদের পক্ষে একসঙ্গে নতুন ফোন কেনা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
টুজি সেবা বন্ধের প্রভাব পড়তে পারে দেশীয় মুঠোফোন উৎপাদকদের ব্যবসায়ও। বর্তমানে বাজারে প্রায় ৯৫০ টাকায় সাধারণ ফিচার ফোন পাওয়া যায়।
অন্যদিকে কম দামের স্মার্টফোনের মূল্যও প্রায় সাড়ে নয় হাজার টাকা। ফলে টুজি ফোনের উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধ হলে দুই ধরনের ফোনের দামের ব্যবধানের কারণে গ্রাহকদের ব্যয় বাড়তে পারে।
পরিসংখ্যানেও দেশে টুজি ফোনের চাহিদার বিষয়টি উঠে এসেছে। ২০২৫ সালে দেশে উৎপাদিত মোট মুঠোফোনের প্রায় ৬৫ শতাংশ ছিল টুজি ফোন। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত হিসাবে, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই হার আরও এক শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ, প্রযুক্তির পরিবর্তন চললেও দেশে টুজি ফোনের চাহিদা কমেনি বরং বেড়েছে।
এ অবস্থায় টুজি থেকে ফোরজিতে স্থানান্তরের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশীয় উৎপাদকদেরও নতুন বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। উৎপাদনব্যবস্থা পরিবর্তন, নতুন প্রযুক্তির ফোন তৈরি এবং ক্রেতাদের সামর্থ্য অনুযায়ী দাম নির্ধারণ—সব মিলিয়ে তাদের সামনে ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি জাকারিয়া শহীদ এ ক্ষেত্রে নিম্নআয়ের গ্রাহকদের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তার মতে, টুজি থেকে ফোরজি নেটওয়ার্কে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় দরিদ্র মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় রাখা জরুরি।
নেটওয়ার্কের আধুনিকায়ন ও তরঙ্গের কার্যকর ব্যবহার একদিকে যেমন টেলিযোগাযোগ খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক টুজি ব্যবহারকারীর জন্য সাশ্রয়ী বিকল্প নিশ্চিত করাও বড় বিষয়। তাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টুজি সেবা বন্ধের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের পাশাপাশি গ্রাহকদের ক্রয়ক্ষমতা ও দেশীয় উৎপাদকদের সক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
এসি//