রাজনীতি

রিমান্ডে আমাকে চরম নির্যাতন করা হয়: তানভীর

কারাবন্দী থাকা অবস্থায় অমানবিক শারীরিক নির্যাতন এবং অজ্ঞাত ইনজেকশন প্রয়োগের ফলে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ার অভিযোগ তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে অব্যাহতি পাওয়া যুগ্ম সদস্য সচিব গাজী সালাউদ্দিন তানভীর।

শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই অভিযোগ জানান।

গুরুতর অসুস্থতার কারণে তানভীর নিজে বক্তব্য দিতে না পারায় তার পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য ইয়াসির আরাফাত।  

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, গেল ২ আগস্ট সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা হওয়ার পর ৫ আগস্ট তানভীরকে গ্রেপ্তার করে বগুড়া কারাগারে পাঠানো হয়। সেখানে তাকে আলো-বাতাসহীন ও অত্যন্ত অপরিচ্ছন্ন সেলে রাখা হতো এবং খাবার হিসেবে দেওয়া হতো পচাবাসি খাদ্য। এর ফলে তিনি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে তাকে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

তানভীরের দাবি, সেখানে চিকিৎসা দেওয়ার নামে তার শরীরে প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি অজ্ঞাত ইনজেকশন পুশ করা হয়, যার প্রভাবে তার শরীর অবশ হতে শুরু করে। একপর্যায়ে একটি বিকল এমআরআই মেশিনে পরীক্ষার নামে কয়েক ঘণ্টা ফেলে রাখার পর তার কোমর থেকে পায়ের অংশ পুরোপুরি পক্ষাঘাতগ্রস্ত (প্যারালাইজড) হয়ে পড়ে।

পরবর্তী সময়ে উন্নত চিকিৎসার কথা বলে ঢাকায় এনে কেরানীগঞ্জ কারাগার ও পিজি হাসপাতালে নেওয়ার পথেও সাদা পোশাকধারী ব্যক্তিরা তাকে শারীরিক নির্যাতন করে বলে অভিযোগ করা হয়।

তানভীর অভিযোগ করেন, টর্চারের সময় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া এবং সালাউদ্দিন আম্মারের নাম ধরে ধরে বলা হতো জুলাইয়ের সবাইকে এরকম নির্যাতন করা হবে।

তানভীর আরও বলেন, ওখানে যে কক্ষে আমাকে রাখা হয়েছিল, আওয়ামী লীগের লোকজন কীভাবে আছে তা দেখা যেত। তারা রাজার হালে জেলখানায় আছে, মোবাইল ফোনে কথা বলে, ভালো খাবার খায়, পরিবারের লোকজনের সঙ্গে নিয়মিত দেখা করে। রাতের বেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের গাড়িতে করে বাইরে নেওয়া হয় এবং ভোরে আনা হয়, এটা আমি দেখেছি। এই দেখাটাই হয়তো আমার জন্য কাল হয়েছে।’

তিনি বলেন, আমার ওপর এতটাই নির্যাতন করা হয়েছে যে, বর্তমানে আমার প্রস্রাব-পায়খানা ব্যাগে ও প্যাডে করতে হচ্ছে। একটি প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি আছি, আমাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে, জানি না চিকিৎসার কী হবে। মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে আছি, আপনাদের কাছে দোয়া চাই এবং দোয়া করি, আমার সঙ্গে যা করা হয়েছে, আর কারও সঙ্গে যেন করা না হয়।

সংবাদ সম্মেলনে এনসিপি সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন ‘ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্স’-এর সদস্য সচিব ডা. আব্দুল আহাদ তানভীরের চিকিৎসাগত তথ্য তুলে ধরে বলেন, তানভীরের শরীরে অন্তত ৫০টির বেশি অজ্ঞাত ইনজেকশনের দাগ এবং ইলেকট্রিক শকের আলামত পাওয়া গেছে। আমরা জানতে চাই, তাকে এই ইনজেকশন কে দিয়েছেন? কোন চিকিৎসক দিয়েছেন? তার নাম ও পরিচয় কী? কেন দেওয়া হয়েছে এবং এর চিকিৎসাগত প্রয়োজনীয়তা কী ছিল?

এই চিকিৎসক বলেন, আমরা তার নিউরোলজিক্যাল ইভালুয়েশন করেছি। শারীরিক পরীক্ষায় আমরা বিভিন্ন ধরনের অস্বাভাবিকতা পেয়েছি। ইলেকট্রিক শক ও ইনজেকশনের চিহ্নের পাশাপাশি তার সেনসরি লেভেল পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ডরসাল বা থোরাসিক ১২ নম্বর ভার্টিব্রার পর থেকে নিচের অংশে তার সেনসেশন সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।

তিনি বলেন, তানভীর তার পা নড়াচড়া করতে পারছেন না। এছাড়া তার প্রস্রাবের নিয়ন্ত্রণও পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। তাকে ক্যাথেটারাইজ করা হয়েছে। চিকিৎসকদের নিয়ে গঠিত বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নিউরোজেনিক ব্লাডারের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাকে ক্যাথেটার দেওয়া হয়েছে।

বর্তমান নিউরোলজিক্যাল দুর্বলতাগুলো কবে এবং কতটা পুনরুদ্ধার হবে, সেটি এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় জানিয়ে চিকিৎসক বলেন, ইলেকট্রিক শকের প্রভাবে শুধু মেরুদণ্ডের স্পাইন নয়, স্পাইনের নার্ভ রুট এবং পেরিফেরাল নার্ভও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমনকি বর্তমানে কিছু বিষয় স্বাভাবিক থাকলেও ভবিষ্যতে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকতে পারে।

তিনি আরও বলেন, আমরা এই ঘটনার একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র তদন্ত দাবি করছি। কীভাবে তিনি গ্রেপ্তার হলেন, পুলিশ হেফাজতে তার সঙ্গে কী ঘটেছে, তার শরীরে ইনজেকশনের চিহ্ন ও ইলেকট্রিক শকের চিহ্ন কীভাবে এলো, কে বা কারা তাকে এসব করেছে এবং এর পেছনে কোনো চিকিৎসাগত কারণ ছিল কিনা– এসব বিষয় নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে।

 

আর/আই

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #গাজী সালাউদ্দিন তানভীর #এনসিপি #ইনজেকশন #রিমান্ড