খেলাধুলা

মেসির রক্তে ব্রাজিলের ছোঁয়া! গবেষণায় উঠে এলো বিস্ময়কর তথ্য

স্পোর্টস ডেস্ক

লিওনেল মেসির নাম উচ্চারিত হলেই সবার আগে মনে আসে আর্জেন্টিনা। তবে ইতিহাসের পাতা বলছে, ভাগ্য একটু ভিন্ন পথে হাঁটলে বিশ্বকাপজয়ী এই মহাতারকাকে হয়তো দেখা যেত ব্রাজিল কিংবা ইতালির জার্সিতেও।

স্প্যানিশ গণমাধ্যমে বহুবার আলোচনা হয়েছে, বার্সেলোনায় দীর্ঘ সময় কাটানোর কারণে মেসি চাইলে স্পেনের হয়েও খেলতে পারতেন। ইতালিও বহুদিন ধরেই দাবি করে আসছে, তাদের রক্তধারার একজন ফুটবলার বিশ্বকাপ জিতেছেন আর্জেন্টিনার হয়ে। তবে এবার সামনে এসেছে আরও বিস্ময়কর এক তথ্য। মেসির পারিবারিক ইতিহাসে এমন একটি অধ্যায় রয়েছে, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলও।

ইতালির ইতিহাসবিদ ও পেশায় ব্যাংকার ফিওরেঞ্জো সান্তিনি দীর্ঘ গবেষণার মাধ্যমে মেসির পারিবারিক বংশতালিকা অনুসন্ধান করতে গিয়ে এই অজানা তথ্য তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে মেসির মাতৃসূত্রের ‘কুচ্চিত্তিনি’ পদবির ইতিহাস খুঁজতে গিয়েই তিনি ব্রাজিলের সঙ্গে এই যোগসূত্রের সন্ধান পান।

ইতালি থেকে আর্জেন্টিনায়

মেসির পুরো নাম লিওনেল আন্দ্রেস মেসি কুচ্চিত্তিনি। গবেষণার শুরুতে সান্তিনি মেসির পিতৃসূত্রের ইতিহাস অনুসন্ধান করেন। সেখানে জানা যায়, তার প্রপিতামহ অ্যাঞ্জেলো মেসি ইতালির মারকে অঞ্চলের মাচেরাতা প্রদেশের রেকানাতি শহরের বাসিন্দা ছিলেন। ১৮৯৩ সালে স্ত্রীকে নিয়ে তিনি ইতালি ছেড়ে আর্জেন্টিনার রোজারিওতে বসতি স্থাপন করেন।

ব্রাজিলে নতুন অধ্যায়

মেসির মাতৃসূত্রের ইতিহাস আরও বেশি চমকপ্রদ।

তার প্রপিতামহের বাবা রানিয়েরো কোচেত্তিনি ইতালির সান সেভেরিনো মার্কে শহরের বাসিন্দা ছিলেন। ১৮৯৯ সালের ২০ সেপ্টেম্বর স্ত্রী রোজা রিক্কেজ্জা এবং দুই সন্তান জুলিয়া ও ফ্রাঞ্চেস্কোকে নিয়ে ‘ওয়াশিংটন’ জাহাজে চড়ে তিনি ব্রাজিলের সান্তোস বন্দরে পৌঁছান।

সাও পাওলো রাজ্যের অভিবাসন জাদুঘরের সংরক্ষিত নথিতে এই যাত্রার প্রমাণ রয়েছে।

ব্রাজিলে পৌঁছানোর পর সরকারি নথিতে রানিয়েরো কোচেত্তিনির নাম পরিবর্তন করে লেখা হয় ‘রামিয়েরো কনচেত্তিনি’। এরপর সাও পাওলোর রিনকাও অঞ্চলের একটি খামারে কৃষিকাজ শুরু করেন তিনি।

কীভাবে হলো ‘কুচ্চিত্তিনি’

এই রিনকাওতেই ১৯০৪ সালের ২৭ জানুয়ারি জন্ম নেন তার ছেলে আরদেরিগো। কিন্তু জন্মনিবন্ধনের সময় উচ্চারণ ও বানানের জটিলতায় আরদেরিগোর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ফেদেরিকো’। একই সঙ্গে পরিবারের পদবিও বদলে যায়। ‘কোচেত্তিনি’ হয়ে যায় ‘কুচ্চিত্তিনি’।

এই ফেদেরিকো কুচ্চিত্তিনিই পরে হন লিওনেল মেসির প্রপিতামহ।

ব্রাজিল ছেড়ে আর্জেন্টিনায়

ফেদেরিকোর জন্মের এক বছর পর, ১৯০৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর পুরো পরিবার ব্রাজিল ছেড়ে আর্জেন্টিনার রোজারিওতে চলে যায়। সেখানেই পরবর্তী প্রজন্মের বসবাস শুরু হয়।

রোজারিওতেই জন্ম নেন মেসির নানা আন্তোনিও কুচ্চিত্তিনি। এরপর জন্ম হয় তার মা সেলিয়া মারিয়া কুচ্চিত্তিনির। আর সেই পরিবারেরই নতুন প্রজন্ম হিসেবে ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন পৃথিবীর আলো দেখেন লিওনেল মেসি।

তিন বছর ধরে গবেষণা

ফিওরেঞ্জো সান্তিনি জানান, মূল রহস্যের সূত্র ছিল ‘কুচ্চিত্তিনি’ পদবি। ইতালিতে এই পদবির কোনো অস্তিত্ব না পাওয়ায় তার কৌতূহল আরও বেড়ে যায়।

২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রায় তিন বছর ধরে তিনি মেসির মাতৃসূত্রের পুরো বংশতালিকা অনুসন্ধান করেন। পরে মেসির মায়ের এক চাচাতো ভাইয়ের কাছ থেকে পাওয়া নথি যাচাই করে নিশ্চিত হন, ব্রাজিলে পৌঁছানোর পরই পরিবারের নাম ও পদবিতে পরিবর্তন আনা হয়েছিল।

এই গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে ২০২২ সালে ইতালির সান সেভেরিনো মার্কে শহর লিওনেল মেসিকে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব প্রদান করে।

ব্রাজিলে শুরু মজার আলোচনা

এই তথ্য প্রকাশের পর ব্রাজিলের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও হাস্যরস। অনেকেই সম্পাদিত ছবিতে মেসিকে ব্রাজিলের হলুদ জার্সিতে দেখিয়েছেন।

কারও কারও মন্তব্য, যদি ভাগ্যের মোড় অন্যদিকে ঘুরত, তাহলে হয়তো ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়কে দেখা যেত ব্রাজিলের জার্সিতে। এমনকি অনেক সমর্থক মজা করে লিখেছেন, মেসি সেলেসাওদের হয়ে খেললে হয়তো ব্রাজিলকে টানা কয়েকটি বিশ্বকাপে ফাইনালের আক্ষেপ নিয়ে থাকতে হতো না।

অবশ্য ইতিহাস শেষ পর্যন্ত অন্য গল্পই লিখেছে। ইতালীয় শিকড়, ব্রাজিলে পারিবারিক অধ্যায় আর আর্জেন্টিনায় বেড়ে ওঠা—সব মিলিয়ে লিওনেল মেসির পরিচয় আজ একটাই। তিনি আর্জেন্টিনার জার্সিতে বিশ্বকাপ জেতা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা কিংবদন্তি।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #লিওনেল মেসি #আর্জেন্টিনা #ব্রাজিল