দরজাটি তখনও ভেতর থেকে বন্ধ। করিডোরজুড়ে ঘন ধোঁয়া, চারপাশে আতঙ্ক আর ছুটে চলা উদ্ধারকর্মীরা। কিন্তু দরজার ওপাশে ছিল এক অদ্ভুত নীরবতা। বহু চেষ্টার পর দরজা ভেঙে যখন তারা কক্ষে প্রবেশ করেন, সামনে ভেসে ওঠে হৃদয়বিদারক এক দৃশ্য।
মৃত্যুর শেষ মুহূর্তেও একে অপরকে আঁকড়ে ধরে ছিলেন তারা। একজন বসে ছিলেন টয়লেট সিটে, অন্যজন পাশের চেয়ারে। কাঁধে মাথা রেখে যেন শেষ আশ্রয় খুঁজছিলেন প্রিয়জনের সান্নিধ্যে। আগুনের শিখা তাদের ছুঁতে পারেনি, কিন্তু ঘন বিষাক্ত ধোঁয়া নিভিয়ে দিয়েছে দুটি জীবন।
গত বুধবার (০৩ জুন) সকালে দিল্লির মালবীয় নগরে অবস্থিত ‘ফ্লারিশ স্টে বিএনবি’ হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান ২১ জন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ১২ জন বিদেশি নাগরিকও। সেই দীর্ঘ তালিকায় থাকা এই দম্পতির শেষ মুহূর্তের গল্প এখন বারবার ফিরে আসছে উদ্ধারকারীদের স্মৃতিতে—একটি গল্প, যেখানে আতঙ্কের মাঝেও শেষ পর্যন্ত টিকে ছিল ভালোবাসার বন্ধন।
উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়া মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, ‘তারা আগুনে মারা যাননি। ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে।’ নিচতলার একটি বাথরুম ভেতর থেকে বন্ধ দেখে সন্দেহ হয়। দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তারা দেখতে পান, মহিলা টয়লেট সিটে বসে আছেন, পাশে চেয়ারে বসা পুরুষটি তাকে শক্ত করে ধরে আছেন। ‘মনে হচ্ছিল আগুন থেকে বাঁচতে ভেতরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু ধোঁয়া তাদের শেষ করে দিয়েছে,’ বলেন শোয়েব।
দুজনের শরীর কালচে হয়ে গিয়েছিল। উদ্ধারকারীরা সিপিআর দিয়ে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। শোয়েব বলেন, ‘আমি এক মিনিট বাইরে এসে সাহস জোগাড় করি। তারপর আবার ঢুকে চেষ্টা করি। কিন্তু আর কিছুই করার ছিল না।’
একই ভবনের আরেক কক্ষে বিছানার কিনারায় বসা অবস্থায় আরেক দম্পতির দগ্ধ মরদেহ পাওয়া যায়। ম্যাক্স হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মী আশরাফ খান বলেন, ‘ভেতরের দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। রিসেপশনের কাছে এক তরুণীর সম্পূর্ণ দগ্ধ দেহ, একটু দূরে হুইলচেয়ারে বসা এক ব্যক্তির পোড়া দেহ। কয়েকজন বিদেশি নাগরিককে অচেতন অবস্থায় বের করে সিপিআর দেওয়া হয়।’

উদ্ধারকারীরা বেজমেন্ট দিয়ে ঢুকতে শাটার কেটে প্রবেশ করেন। ধোঁয়ায় ভরা অন্ধকারে, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়া তারা একের পর এক মানুষকে চাদরে তুলে নামান। ‘দ্বিতীয় তলায় পৌঁছানোর সময় মনে হচ্ছিল আমরা নিজেরাই বাঁচব না। মেঝের টাইলস উঠে গিয়েছিল, পায়ে কেটে যাচ্ছিল,’ বলেন আশরাফ।
ভবনের বাইরে তখন আরেক দৃশ্য। স্থানীয় বাসিন্দারা জানালা ভেঙে আটকে পড়াদের লাফ দিতে বলছেন। রিয়াজউদ্দিন মানসুরি ও তার ছেলে আরমান ভবনের নিচে ২০-২২টি ম্যাট্রেস বিছিয়ে দেন, যাতে লাফিয়ে পড়লে আঘাত কম লাগে। এতে তার প্রায় দুই লাখ রুপির ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘মানবিকতার জন্য করেছি।’
একটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, এক বিদেশি নাগরিক ছাদে দাঁড়িয়ে একটি খুঁটি আঁকড়ে নিচে নামার পথ খুঁজছেন—ধোঁয়ার ভেতর আতঙ্কিত, অসহায়।
আগুনের সূত্রপাত হয় বুধবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বেজমেন্টে। প্রাথমিকভাবে শর্ট সার্কিটকে কারণ হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে ১৭টি ফায়ার টেন্ডার কাজ করে। অন্তত ৫৮ জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
অগ্নিকাণ্ডের পর শুরু হওয়া তদন্তে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। যে ভবনটি অতিথিদের নিরাপত্তার আশ্রয় হওয়ার কথা ছিল, সেটিই যেন পরিণত হয়েছিল মৃত্যুফাঁদে। ভবনটিতে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য ছিল মাত্র একটি পথ। প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা সনদও ছিল না। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ছয়টি কক্ষের অনুমোদন নিয়ে সেখানে পরিচালনা করা হচ্ছিল ২৫টি কক্ষ। অনেক জানালাই স্থায়ীভাবে সিল করে রাখা হয়েছিল, ফলে বিপদের মুহূর্তে বেরিয়ে আসার সুযোগও ছিল সীমিত।
ঘটনার পর হোটেলের মালিক লাভকেশ বাজাজকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানিয়েছেন, আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর আতঙ্কে তিনি নিজের গাড়ি নিয়ে ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যান। এমনকি জ্বলতে থাকা ভবনের সামন দিয়েই তিনি সরে পড়েছিলেন বলে স্বীকার করেছেন।
এদিকে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন সেই কক্ষে একে অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে থাকা দম্পতির শেষ মুহূর্তের ছবি এখন শুধু নিহতের সংখ্যা বাড়ানো কোনো পরিসংখ্যান নয়। এটি হয়ে উঠেছে এক ভয়াবহ রাতের মানবিক প্রতিচ্ছবি—যেখানে মৃত্যুভয়ের মধ্যেও ছিল প্রিয়জনকে শেষবার আঁকড়ে ধরে থাকার আকুতি, ছিল ভালোবাসার নিঃশব্দ উপস্থিতি, আর ছিল অসহায় মানুষের নির্মম পরিণতির এক বেদনাময় সাক্ষ্য।
সূত্র: এনডিটিভি
এসি//