উত্তরের সীমান্তঘেঁষা জেলা কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে মাদক সেবনের প্রবণতা। ভয়াবহ এই নেশার কবলে পড়ে বিপথে যাচ্ছে তরুণ-যুবসমাজ এমনকি স্কুল-কলেজের কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও। ঘটছে আত্মহত্যার ঘটনা।
সম্প্রতি ফুলবাড়ী উপজেলায় এক মাদকাসক্ত যুবকের আত্মহত্যার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
নিহত চন্দন কুমার রবিদাস (৩৫) পেশায় একজন স্বর্ণকার ছিলেন। তিনি উপজেলার সীমান্তবর্তী কুরুষাফেরুষা গ্রামের দ্বিনেশ কুমার রবিদাসের ছেলে। এক ছেলে ও দুই মেয়ের জনক চন্দনের আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবার ও এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
নিহতের বাবা দ্বিনেশ কুমার রবিদাস ও তার ভাই গোবিন্দ কুমার রবিদাস এবং অনিল কুমার রবিদাস জানান, চন্দন অনেক কষ্ট করে একটি স্বর্ণের দোকান প্রতিষ্ঠিত করেছে। সেই দোকান দিয়ে সুন্দর ভাবে দুই মেয়ে ও এক ছেলেসহ পরিবারের ভরণপোষণ চালিয়ে আসছিলেন। এক পর্যায়ে সে মাদক সেবনে জড়িয়ে যান। তার অস্বাভাবিক মাদক সেবনে পরিবারে চলে অশান্তি। এভাবেই ১০ থেকে পনের বছর কেটে যায়। তবুও তার মাদক সেবন করা বন্ধ করতে পারেননি।
গত পাঁচ-ছয় মাস ধরে মাদক সেবনের মাত্রা আরও বেড়ে যাওয়ায় তিন মাস আগে মাদক নিরাময় সেন্টারে রাখা হয়। সেখান থেকে এসে প্রথমে দুই তিন সপ্তাহ মাদক সেবনে করেনি। এরপর আবারও সেই মাদক সেবনে জড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে সে মাদক সেবন অবস্থায় দিনে দুপুরে পরিবারের অজান্তে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।
স্থানীয়রা জানান, চন্দনের মৃত্যুর দিন ভোর রাতে নাওডাঙ্গা এলাকায় এক বিধবা নারী গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। তাদের দাবি তার ছেলে মাদকাসক্ত ছিল এবং তাকে সুপথে ফেরাতে তিনি বহু চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। স্বামীহারা ওই নারী ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ধীরে ধীরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। একপর্যায়ে চরম হতাশা থেকে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে, নাওডাঙ্গা ইউনিয়ন এখনো কমপক্ষে চার পাঁচ যুবক মাদক নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রয়েছে। ওই নাওডাঙ্গা ইউনিয়নে নয় ফুলবাড়ী উপজেলা জেলা জুড়ে বেশ কিছু যুবক তাদের পরিবার সন্তানদের মাদকাসক্ত থেকে দুরে রাখতে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসার জন্য রেখেছেন।
গোরকমন্ডল এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন, “মাদকের ভয়াবহতা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। যেভাবে আমাদের যুবসমাজ মাদকাসক্তির দিকে ঝুঁকছে, তাতে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠতে পারে।”
তিনি জানান, ‘তার ছোট ভাইও মাদকাসক্ত হয়ে পড়ায় গত দুই মাস ধরে রংপুরের একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রয়েছে। প্রতি মাসে চিকিৎসা বাবদ প্রায় ৪০ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে, যা একজন কৃষকের পক্ষে বহন করা অত্যন্ত কষ্টকর। তবুও ভাইকে সুপথে ফিরিয়ে আনতে তিনি কোনোভাবেই হাল ছাড়বেন না বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন’।
নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের কুরুষাফেরুষা এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মজিদ মানিক বলেন, ‘কি বলবো ভাই, বালারহাট এলাকায় যে হারে মাদক সেবন বেড়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমার প্রতিবন্ধী কলেজপড়ুয়া ছেলেও একসময় মাদকে জড়িয়ে পড়ে। একজন অভিভাবক হিসেবে তাকে বাঁচাতে দুই দফায় প্রায় এক বছর রংপুরের মাদক নিরাময় কেন্দ্রে রেখেছিলাম। কিন্তু তারপরও তাকে পুরোপুরি মাদক থেকে ফেরাতে পারিনি’।
তিনি বলেন, ‘ছেলের কারণে সমাজে আমাদের মান-সম্মানও ক্ষুণ্ন হয়েছে। যতবার তাকে বাধা দিয়েছি, ততবারই তার কাছ থেকে অপমানিত হয়েছি। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে নিজ ছেলেকেই পুলিশের হাতে তুলে দিই। সে সময় ছয় মাস জেলেও ছিল। জেল থেকে বের হওয়ার পরও আবার মাদক সেবনে জড়িয়ে পড়ে। পরে ধীরে ধীরে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। তাকে দুই-তিনবার তাবলিগ জামাতেও পাঠিয়েছি। এখন সে ঢাকায় একটি গার্মেন্টসে কাজ করছে’।
নাওডাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল হানিফ সরকার জানান, ফুলবাড়ী উপজেলার সীমান্তঘেঁষা এলাকাগুলোতে মাদকের বিস্তার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এখন প্রায় সব ধরনের মাদক সহজলভ্য হয়ে পড়েছে। আমাদের স্কুল-কলেজের কিছু শিক্ষার্থীও মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। আমরা নিয়মিত ক্লাস ও সভা-সমাবেশে মরণনেশা মাদকের ভয়াবহ ক্ষতির দিকগুলো তুলে ধরছি। তারপরও মাদকের দৌরাত্ম্য কমানো যাচ্ছে না।
নাওডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হাছেন আলী জানান, উপজেলার সীমান্তঘেষা নাওডাঙ্গা ইউনিয়নে ক্রমান্বয়ে মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে। কোনোভাবেই মাদকের প্রবণতা কমানো যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে মাদক নির্মূলে বিজিবি, পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে বড় বড় চালান উদ্ধার করছেন। তবে কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। অভিভাবক, সচেতন মহল, স্কুল কলেজ শিক্ষক ও যুব সমাজ একসঙ্গে এগিয়ে এলে মাদক নির্মূল করা সম্ভব।
ফুলবাড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাহমুদ হাসান নাঈম জানান, মাদক সেবন ও মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নিয়মিতভাবে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং এটি কখনোই বন্ধ হবে না। মাদকের বিষয়ে যেকোনো তথ্য পেলে তা গুরুত্বসহকারে নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও তিনি জানান।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) দিলারা আক্তার জানান, ফুলবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী যেসব এলাকায় মাদকের প্রভাব বেশি, সেখানে অনেক মানুষ কোনো না কোনোভাবে মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এসব এলাকায় পুলিশের স্থায়ী চেকপোস্ট স্থাপন অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে বালারহাট এলাকায় একটি পুলিশ চেকপোস্ট স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে সমাজের সবাইকে মাদকের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করারও আহ্বান জানান তিনি।
আই/এ