দেশজুড়ে

বাণিজ্যিকভাবে বাইনুর জাতের আঙ্গুর চাষে সফল দুই উদ্যোক্তা

কুড়িগ্রাম উত্তর প্রতিনিধি

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে  বিদেশি প্রজাতি (বাইনুর) জাতের লাল আঙ্গুর চাষ করে সফলতা অর্জন করেছেন কৃষি উদ্যোক্তা রুহুল আমীন ও হাসেম আলী। তাদের এই যৌথ উদ্যোগে ইতোমধ্যেই এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এবং স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।

উপজেলার গংগাহাট বাজার সংলগ্ন আজোয়াটারী এলাকায় দুই বিঘা জমিতে প্রায় ১০ বছর অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন তাদের আঙ্গুর বাগান।

বর্তমানে তাদের বাগানে রয়েছে ৪৬০ টি বাইনুর জাতের আঙ্গুর গাছ। ২০২২ সালে প্রথম ধাপে ৫০টি গাছ থেকে আঙ্গুর বিক্রি করেন প্রায় ৫ মন, ২০২৩ সালে দ্বিতীয় ১০ মন, ২০২৪ সালে তৃতীয় ধাপে ১৫ মন এবং ২০২৫ সালে চতুর্থ ধাপে ২০ মন আঙ্গুর বিক্রি করেন। চলতি ২০২৬ সালে পঞ্চম ধাপে ৬০টি আঙ্গুর গাছ থেকে ৪০–৪৫ মন বিক্রির সম্ভাবনা দেখছেন এই দুই উদ্যোক্তা।

সরেজমিনে দেখা গেছে,  ব্যাংক কর্মকর্তা রুহুল আমীন ও হাসেম আলীর বাগানে শুধু বাইনুর জাতের আঙ্গুরই নয়,-বিদেশি বিভিন্ন জাতের আঙ্গুরের গাছে গাছে ঝুলছে সবুজ আঙ্গির গুলো। এছাড়াও আঙ্গুরের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় তিন শতাধিক বিভিন্ন ফলজ গাছ রয়েছে। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের সেই স্বপ্নের বাগানটি দেখতে প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ভিড় করছেন। অনেকেই আগ্রহ নিয়ে তাদের কাছ থেকে জাতের আঙ্গুরের চারা সংগ্রহ করছেন।

মাগুরা জেলা থেকে আগত সহকারী শিক্ষক ও সৌখিন কৃষি উদ্যোক্তা রামপ্রসাদ বলেন, কৃষি উদ্যোক্তা রুহুল আমীন ও হাসেম আলীর অসাধারণ ধৈর্য ও পরিশ্রমই তাদের আজকের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। প্রায় তিন বছর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের আঙ্গুর চাষ দেখে তিনি মুগ্ধ হন। পরবর্তীতে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং একসময় সরেজমিনে বাগান পরিদর্শনের সুযোগ পান।

তিনি জানান, প্রথমবার বাগান দেখতে গিয়েই বাইনুর জাতের ২০টি আঙ্গুরের চারা সংগ্রহ করে নিজের যাত্রা শুরু করেন। পরে দ্বিতীয় দফায় আরও ১৫টি চারা কিনে বাড়ির উঠান ও ছাদে রোপণ করেন। বর্তমানে সেসব গাছে ফলন আসা শুরু করেছে, যা তাকে আরও উৎসাহিত করেছে।

এই বাগানের উদ্যোক্তা হাসেম আলী বলেন, ইউক্রেনে অবস্থানরত এক বন্ধুর কাছ থেকে আঙ্গুর চাষের প্রাথমিক ধারণা পান তিনি। পরে তার মামা, ব্যাংক কর্মকর্তা রুহুল আমীনের সহযোগিতায় রাশিয়া ও ইউক্রেনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে উন্নত জাতের আঙ্গুরের চারা সংগ্রহ করা হয়। ২০১৭ সালে মাত্র ৪০টি চারা দিয়ে যাত্রা শুরু করেন তিনি। শুরুতে স্থানীয়দের অনেকেই এ উদ্যোগ নিয়ে সন্দেহ ও কটাক্ষ করলেও তিনি থেমে থাকেননি। আট মাস পরই কয়েকটি গাছে আঙ্গুর ধরতে শুরু করে, যা তাকে আরও উৎসাহিত করে। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে গাছের সংখ্যা বাড়ানো হয়।

২০১৮, ২০১৯ ও ২০২১ সালেও পরীক্ষামূলকভাবে ফলন এলেও সেগুলো আত্মীয়স্বজন ও আগ্রহী দর্শনার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।

২০২২ সাল থেকে তিনি বাণিজ্যিকভাবে আঙ্গুর বিক্রি শুরু করেন। ওই বছর ৫০টি গাছ থেকে প্রায় ৫ মন, ২০২৩ সালে ১০ মন, ২০২৪ সালে ১৫ মন এবং ২০২৫ সালে ২০ মন আঙ্গুর বিক্রি করেন। চলতি ২০২৬ সালে ৬০টি গাছ থেকে ৪০–৪৫ মন ফলনের আশা করছেন, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৮ লাখ টাকা। বর্তমানে দুই বিঘা জমিতে ৪৬০টি আঙ্গুর গাছ রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন জাতের চারা ৩০০ থেকে ৬ হাজার টাকা দরে বিক্রি করে বছরে প্রায় ৮ লাখ টাকা আয় হচ্ছে। সব মিলিয়ে খরচ বাদ দিয়ে এ বছর প্রায় সাড়ে ৮ লাখ টাকা লাভের আশা করছেন তিনি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছা. নিলুফা ইয়াছমিন বলেন, বেলে-দোঁয়াশ মাটিতে আঙ্গুর চাষ করে কৃষি উদ্যোক্তা রুহুল আমীন ও হাসেম আলী ফুলবাড়ীসহ পুরো কুড়িগ্রাম জেলায় এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাদের বাগানের আঙ্গুর যেমন সুস্বাদু, তেমনি ফলনও ভালো হচ্ছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও দেওয়া হবে। তিনি আরও জানান স্থানীয়দের মতে, এই দুই উদ্যোক্তরা এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে নতুন ফল চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়াবে এবং কৃষিতে  গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আই/এ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #কুড়িগ্রাম #আঙ্গুর