বিশেষ যত্নে চোখ ভালো রাখুন, কমবে ছানি পড়ার ঝুঁকি
বয়স বাড়ার সাথে সাথে চোখের নানা সমস্যা দেখা দেওয়া স্বাভাবিক। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত এবং উদ্বেগজনক সমস্যা হলো ছানি। একসময় মনে করা হতো, ছানি শুধু বয়স্কদের রোগ। কিন্তু এখন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ, কোলেস্টেরলসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার কারণে তুলনামূলক কম বয়সেও ছানি পড়তে দেখা যাচ্ছে।
ছানি পড়তে শুরু করলে দৃষ্টি ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যায়। চারপাশের উজ্জ্বল ও রঙিন দৃশ্যও মলিন মনে হতে থাকে। সময়মতো চিকিৎসা না করালে দৈনন্দিন কাজকর্মেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই বয়স ৫০ পার হওয়ার পর চোখের প্রতি বাড়তি যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
ছানি কী এবং কেন হয়?
চোখের লেন্সকে অনেকটা ক্যামেরার লেন্সের সঙ্গে তুলনা করা যায়।
ক্যামেরার লেন্সে ধুলো বা দাগ পড়লে যেমন পরিষ্কার ছবি তোলা যায় না, তেমনি চোখের লেন্স অস্বচ্ছ হয়ে গেলে দৃষ্টিও ঝাপসা হয়ে যায়।
চোখের লেন্স মূলত প্রোটিন ও পানি দিয়ে তৈরি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লেন্সের স্বচ্ছতা বজায় রাখা প্রোটিনের কার্যকারিতা কমে যায়।
ফলে লেন্সে ঘোলাটে আস্তরণ তৈরি হয় এবং দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। এই অবস্থাকেই ছানি বলা হয়।
ছানি একবার তৈরি হলে শুধুমাত্র চশমা ব্যবহার করে সমস্যার সমাধান করা যায় না।
প্রয়োজন হলে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অস্বচ্ছ লেন্সের পরিবর্তে কৃত্রিম লেন্স বসানো হয়। তবে ছানি হওয়ার আগেই প্রতিরোধে মনোযোগ দেওয়া সবচেয়ে ভালো।
বয়স্কদের চোখ ভালো রাখার উপায়
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বছরে অন্তত একবার চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে চোখ পরীক্ষা করানো উচিত। চোখ জ্বালা, অতিরিক্ত পানি পড়া কিংবা হঠাৎ ঝাপসা দেখার মতো লক্ষণকে অবহেলা করা যাবে না।
ডায়াবেটিস ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন
অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ ছানি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই রক্তে শর্করা ও রক্তচাপ স্বাভাবিক মাত্রায় রাখা জরুরি।
অতিবেগনি রশ্মি থেকে চোখ রক্ষা করুন
সূর্যের অতিবেগনি রশ্মি চোখের জন্য ক্ষতিকর। বাইরে বের হলে ভালো মানের সানগ্লাস ব্যবহার করুন। পাশাপাশি দীর্ঘ সময় মোবাইল, কম্পিউটার বা টেলিভিশনের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকা কমাতে হবে।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া স্টেরয়েড ব্যবহার নয়
দীর্ঘদিন স্টেরয়েডজাতীয় ড্রপ বা ওষুধ ব্যবহার করলে ছানি পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। তাই এসব ওষুধ অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গ্রহণ করতে হবে।
চলন্ত যানবাহনে বই পড়া এড়িয়ে চলুন
চলন্ত বাস, ট্রেন বা মেট্রোয় বই পড়লে চোখের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। একইভাবে কম আলোতে পড়াশোনা বা মোবাইল ব্যবহার করাও চোখের জন্য ক্ষতিকর।
যেসব চোখের পরীক্ষা নিয়মিত করানো উচিত
টোনোমেট্রি পরীক্ষা
পরিবারে গ্লকোমার ইতিহাস থাকলে এই পরীক্ষা করানো প্রয়োজন। এর মাধ্যমে চোখের অভ্যন্তরীণ চাপ পরিমাপ করা হয়।
রেটিনা ও অপটিক নার্ভ পরীক্ষা
ডায়াবেটিস থাকলে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির ঝুঁকি আছে কি না, তা এই পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায়।
স্লিট ল্যাম্প পরীক্ষা
বিশেষ মাইক্রোস্কোপ ও তীব্র আলোর সাহায্যে চোখের লেন্স পরীক্ষা করা হয়। এতে লেন্স কতটা স্বচ্ছ আছে এবং ছানি হওয়ার সম্ভাবনা কতটা, তা নির্ণয় করা যায়।
ডাইলেটেড ফান্ডাস পরীক্ষা
বয়সজনিত কারণে রেটিনার কেন্দ্রীয় অংশ বা ম্যাকুলা ক্ষতিগ্রস্ত হলে দৃষ্টিশক্তি কমে যেতে পারে।
এই পরীক্ষা করলে রেটিনা, রক্তনালি ও অপটিক নার্ভের অবস্থা বিস্তারিতভাবে জানা যায় এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেভাগেই শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
মনে রাখুন
ছানি বয়সজনিত একটি সাধারণ সমস্যা হলেও সচেতনতা ও নিয়মিত চোখের যত্নের মাধ্যমে এর ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, ডায়াবেটিস ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত চোখের পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললেই দীর্ঘদিন সুস্থ রাখা যাবে আপনার দৃষ্টিশক্তি।
পি/ডি