যে সাপ নাচাচ্ছেন, একদিন সেই সাপই ছোবল দেবে: শফিকুর রহমান
নিজেদের বিশৃঙ্খলা, ব্যর্থতা ও অযোগ্যতা আড়াল করতে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ‘যে সাপ আপনারা নাচাচ্ছেন, সেই সাপই একদিন ছোবল দেবে। ছোবল দিয়ে সাপ পালিয়ে যাবে, আপনাদের মরদেহ পড়ে থাকবে।’
মঙ্গলবার (০৩ নভেম্বর) দুপুরে কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান তার সঙ্গে দেখা করতে গেলে এসব কথা বলেন জামায়াত আমির।
এ সময় বিরোধী দলের সমালোচনা না করে নিজেদের ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠার দিকে মনোযোগ দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘আমরা সংসদের ভেতরেও বলেছি, এই বসন্তের কোকিল, যারা বসন্তকালে কুহু কুহু করতে এসেছে, বসন্তকাল পার হওয়ার পর তাদের আর দেখা পাবেন না। আপনাদের যখন গ্রীষ্মকাল কিংবা বর্ষাকাল আসবে, তখন এদের আর খুঁজে পাবেন না। আপনাদের ফেলে রেখে তারা পালিয়ে যাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সাবধান করে দিচ্ছি, বিরোধী দলের চরিত্রহনন বাদ দিয়ে নিজেদের ব্যর্থতার সমাধানের চেষ্টা করুন। যদি তা করেন এবং মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দূর হয়, মানুষ আপনাদের সমর্থন করবে। আর যদি মনে করেন, অতীতের মতো স্বৈরাচারী কায়দায় প্রতিবাদী কণ্ঠকে দমিয়ে দেবেন, স্তব্ধ করে দেবেন, তাহলে আপনাদের দুঃসংবাদ দিচ্ছি, বাংলাদেশে আর তা হবে না। এই জনগণ আর ফ্যাসিবাদকে কখনো কবুল করে নেবে না। ফ্যাসিবাদের কাছে আর মাথা নত করবে না।’
সংঘবদ্ধ জনশক্তি অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে এবং ভবিষ্যতেও দাঁড়াবে উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, ‘দিন দিন এর গতি বৃদ্ধি পাবে। একটা জায়গায় গিয়ে এর পূর্ণ সমাধান হবে।’
এ সময় মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের বিমানবন্দরে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন ডা. শফিকুর রহমান।
তার দাবি, আখতারুজ্জামানের প্রতিবাদের পর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসব সমস্যা অনেকটাই কমেছে।
তিনি বলেন, ‘তার প্রতিবাদ শতভাগ কাজে লেগেছে। সাধারণ যাত্রী ও প্রবাসীদের জন্য তিনি যে প্রতিবাদ করেছিলেন, তার সুফল এখন মানুষ পাচ্ছে।’
জামায়াত আমির বলেন, বিমানবন্দরে প্রতিবাদ করতে গিয়ে তাদের সহকর্মী কারও গায়ে হাত দেননি। অথচ তার বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা দেওয়া ও সরকারি কর্মকর্তার গায়ে হাত তোলার অভিযোগে মামলা করা হয়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের সহকর্মী তিনি কারও গায়ে হাত দেননি। কিন্তু তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা চাপানো হলো যে তিনি সরকারি কাজে বাধা দিয়েছেন এবং সরকারি কর্মকর্তার গায়ে হাত দিয়েছেন। যা ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমরা এর প্রতিবাদ তখনই করেছি।’
ঘটনার দিন তাৎক্ষণিকভাবে দুই কর্মীকে সাময়িক বরখাস্ত করার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন ডা. শফিকুর রহমান। তাদের কোনো অপরাধ না থাকলে কেন বরখাস্ত করা হয়েছিল, সে প্রশ্ন রাখেন তিনি।
বিমানবন্দরে ট্রলি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কথাও তুলে ধরেন জামায়াত আমির।
মেজর আখতারুজ্জামান এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে ট্রলি পেতে যাত্রীদের লটারির মতো টানাটানি করতে হয়। কেউ পান, কেউ পান না। একটি ট্রলি তিনজন যাত্রীর জন্য হওয়ার কথা। ইতিমধ্যে দুই দফায় ৩০০টি নতুন ট্রলি যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ তার উত্থাপিত দুর্বলতাও মেনে নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ব্যাগ কাটা ও লাগেজ চুরির অভিযোগের বিষয়েও আখতারুজ্জামান কথা বলেছিলেন বলে জানান ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, এখন মালামাল ওঠানো-নামানোর কাজে নিয়োজিত কর্মীদের শরীরে বডি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে লাগেজ পাওয়া যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ধন্যবাদ মেজর আখতারুজ্জামান। আপনার প্রতিবাদ শতভাগ কাজে লেগেছে। কাজ দিচ্ছে। এর সুফল এখন যুগ যুগ ধরে শাহজালাল বিমানবন্দরে ভোগান্তির শিকার হওয়া যাত্রীরা পাচ্ছেন। বিশেষ করে আমাদের প্রবাসী ভাই-বোনেরা।’
আখতারুজ্জামানের কারাভোগের প্রসঙ্গ টেনে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, প্রতিবাদ করার কারণে তাকে কারাগারে যেতে হয়েছে। তবে অল্প সময়ের কারাভোগের পরই তিনি তাঁর প্রতিবাদের সুফল পেয়েছেন। এ সময় নিজের দীর্ঘ কারাভোগের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
জামায়াত আমির বলেন, ‘জেল তো বহু খেটেছি। অনেক প্রতিবাদও করেছি। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ফল পাইনি। আপনি পেয়ে গেছেন। আমরা আরও লম্বা সময় জেলে ছিলাম, কিন্তু ফল পাইনি। এক মাসের বিনিময়ে আপনাকে একটা আগের কণ্ঠকে খাঁচায় ঢোকানোর চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু খাঁচায় কত দিন বন্দি রাখবেন? রাখতে পারেননি, পারবেনও না।’
একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও লজ্জাজনক মামলা দেওয়া হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন জামায়াত আমির। তাকে রিমান্ডে নেওয়ার ঘটনাকেও লজ্জাজনক বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ভিত্তিহীন এই মামলায় নিম্ন আদালত থেকে জামিন দেওয়া হয়নি। চোখ বেঁধে, মাথায় হেলমেট ও বুকে সেফটি ভেস্ট পরিয়ে তাঁকে আদালতে নেওয়া হয়েছে। এরপরও সেখান থেকে জামিন দেওয়ার সাহস হয়নি। হাইকোর্ট পর্যন্ত যাওয়ার পর তাকে চেম্বার জজ আদালতে নেওয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সবই লজ্জার, ঘাটে ঘাটে লজ্জা, মহালজ্জা। কিন্তু যাদের লজ্জা থাকার কথা, তাদের তো লজ্জা লাগে না।’
লজ্জাবোধ নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, ‘যার গায়ে কাপড় নেই, তাকে দেখে সম্ভ্রমশীল মানুষ লজ্জা পায়। কিন্তু যার গায়ে কাপড় নেই, তার কোনো লজ্জা নেই। লজ্জা কবে আসবে? লজ্জা কি নির্বাসনে থাকবে? লজ্জা আসা উচিত।’
সবশেষে জনগণের অধিকার জনগণের হাতে ফিরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন জামায়াত আমির।
তিনি বলেন, ‘যত দিন পর্যন্ত জনগণের অধিকার জনগণের হাতে ফিরে না যাবে, আমাদের লড়াই তত দিন চলবে। আমাদের প্রিয় সহকর্মী প্রমাণ করেছেন, আমরা কোনো রক্তচক্ষুকে ভয় পাই না। এটাই আমাদের সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।’
এসি//