জাতীয়

বার থেকে বস্তি, এরপর তুরাগ নদ—তাহসিফের মৃত্যুর রাত ঘিরে রহস্য

উত্তরার একটি রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার থেকে বের হওয়ার পর টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরি। সেখান থেকে শেষ পর্যন্ত তার মরদেহ উদ্ধার করা হয় তুরাগ নদে। মাঝের এই সময়টুকুতে ঠিক কী ঘটেছিল, তা এখনো পরিষ্কার নয়। তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে উত্তরার নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার, টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তি ও তুরাগ নদ—এই তিনটি স্থান।

তাহসিফের মৃত্যুর আগের রাতের ঘটনাপ্রবাহ জানতে নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজ, জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও পরীক্ষাগারের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করছেন তদন্তকারীরা। বিশেষ করে বার থেকে বের হওয়ার পর বস্তি এলাকায় যাওয়ার কারণ, সেখানে কারা তাদের ধাওয়া করেছিল, পুলিশের উপস্থিতিতে কী ঘটেছিল এবং তাহসিফ নদে পড়ার পর কী হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তারা।

আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে উত্তরার একটি রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ ও জেরিকা তাসনিম দিশার সঙ্গে ছিলেন তাহসিফ। পরে তারা যান টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তি এলাকায়। এরপর কী ঘটেছিল, তা নিয়ে এখনো রয়েছে একাধিক প্রশ্ন।

নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে প্রবেশ করেন তাহসিফ, দীপ ও দিশা। মোটরসাইকেলে সেখানে পৌঁছে তিনজনকে একসঙ্গে রেস্টুরেন্টে ঢুকতে দেখা যায়।

রেস্টুরেন্টের অন্য একটি ক্যামেরার ফুটেজে তাহসিফ ও দিশাকে লিফটের সামনে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। কিছুক্ষণ পর হেলমেট পরা অবস্থায় সেখানে আসেন দীপ। পরে তিনজন একসঙ্গে লিফটে ওঠেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর রাত ১১টা ৫১ মিনিটে তাদের রেস্টুরেন্ট থেকে বের হতে দেখা যায়।

তাহসিফ ও দিশার মধ্যে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল বলেও দাবি করেছে একটি সূত্র। ওই দিন কোনো একটি বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে মনোমালিন্য হয়েছিল বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি গোয়েন্দারা।

নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারের মহাব্যবস্থাপক ও সাবেক মেরিটাইম ক্যাপ্টেন হাসান হাবিব জানান, তাহসিফ শেষবার রেস্টুরেন্টে যাওয়ার দিন তার সঙ্গে দেখা হয়নি। তবে এর আগের তিন দিন তাহসিফ একই তরুণীকে নিয়ে সেখানে এসেছিলেন। তাদের সঙ্গে দীপ ও দীপের সঙ্গে আরেক তরুণীও ছিলেন।

হাসান হাবিব জানান, তারা সেখানে গান শুনেছেন, নাচ করেছেন ও সময় কাটিয়েছেন। আগের একদিন তাহসিফের সঙ্গে তার পরিচয় ও কথা হয়েছিল। তখন তাহসিফ নিজেকে ৭৭ লং কোর্সের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে গোপন দায়িত্বে কাজ করছেন বলে জানিয়েছিলেন।

বস্তিতে যাওয়ার কারণ নিয়ে প্রশ্ন

রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার পর তাহসিফ ও দীপ মোটরসাইকেলে করে টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তি এলাকায় যান। নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, ২৮ অক্টোবর রাত ১২টা ৫২ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে তারা মাজার সড়ক দিয়ে বস্তি এলাকায় প্রবেশ করেন। অন্য একটি ফুটেজে দুজন করে আরোহী নিয়ে তিনটি মোটরসাইকেলকে একসঙ্গে বস্তিতে ঢুকতে দেখা যায়। এর মধ্যে প্রথম মোটরসাইকেলে ছিলেন তাহসিফ।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তুরাগ নদসংলগ্ন ওই এলাকায় যাওয়ার পেছনে মাদক গ্রহণের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ওই এলাকায় মাদকসেবীদের আনাগোনা রয়েছে। সেখানে ইয়াবা ও হেরোইন সেবনের তথ্যও তদন্তে এসেছে। তবে তাহসিফ সেখানে গিয়ে কোনো মাদক গ্রহণ করেছিলেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

মৃত্যুর আগে তাহসিফ অ্যালকোহল বা অন্য কোনো নেশাজাতীয় পদার্থ গ্রহণ করেছিলেন কি না, তা জানতে তার রক্ত, পাকস্থলী, কিডনি ও ভিসেরার নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে।

তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বস্তি এলাকায় অবস্থানের সময় তাহসিফ উচ্চস্বরে চিৎকার-চেঁচামেচি করেন। একপর্যায়ে মাদকসংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি সেখানে আসেন। পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে কয়েকজন তাদের ধাওয়া করেন বলে জানা গেছে।

দীপের বক্তব্য ঘিরে তদন্তকারীদের প্রশ্ন

জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, ধাওয়ার মুখে তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন। এ সময় তিনি নিজে একটি পিলারের পাশে লুকিয়ে ছিলেন। পরে টহলরত পুলিশ সদস্যরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তাহসিফের সঙ্গে সেখানে আসার কথা জানান তিনি।

দীপের দাবি, পুলিশ সদস্যরা তাকে দ্রুত সেখান থেকে চলে যেতে বলেন। বস্তি থেকে বের হওয়ার রাস্তা খুঁজে পেতে তার বেশ সময় লাগে। পরে মূল সড়কে উঠে তিনি মোহাম্মদপুরের বাসায় চলে যান।

তবে দীপের বক্তব্যের কয়েকটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে তদন্তকারীদের। তাহসিফ নদে ঝাঁপ দিলে তাকে উদ্ধারের চেষ্টা না করে দীপ কেন সেখান থেকে চলে গেলেন, কারা তাদের ধাওয়া করেছিল এবং কী কারণে ধাওয়া করা হয়েছিল—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ধাওয়া করা ব্যক্তিদের সঙ্গে তাহসিফ বা দীপের আগে কোনো পরিচয় কিংবা বিরোধ ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরিফুর রহমান জানান, ওই এলাকায় পুলিশের নিয়মিত টহল থাকে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যরা সেখানে দায়িত্ব পালন করেন।

দিশার বক্তব্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে দীপের তথ্য

এদিকে তাহসিফের সঙ্গে বারে যাওয়া জেরিকা তাসনিম দিশাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চার দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। বারে যাওয়ার আগে তাহসিফের সঙ্গে কোথায় দেখা হয়েছিল, তাদের মধ্যে কী কথা হয়েছিল, রেস্টুরেন্টে বসে কী আলোচনা হয় এবং সেখান থেকে বের হওয়ার পর তাদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ে দিশার কাছ থেকে তথ্য জানতে চাইছেন তদন্তকারীরা।

দিশার বক্তব্যের সঙ্গে আগে রিমান্ডে থাকা দীপের দেওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। দুজনের বক্তব্যে কোনো অসঙ্গতি পাওয়া গেলে তা তদন্তে নতুন সূত্র দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নৌ পুলিশের পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মামুন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এখন পর্যন্ত অনেক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে সব বিষয়ে মতামত প্রকাশ করা যাবে না।’

তদন্তকারীদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার থেকে বের হওয়ার পর বস্তি এলাকায় কী ঘটেছিল এবং কীভাবে তাহসিফের মৃত্যু হলো। এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে দীপ ও দিশার বক্তব্য, নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজ এবং পরীক্ষাগারের প্রতিবেদন মিলিয়ে দেখছেন তারা।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন