মিসাইলের মতো আছড়ে পড়ল বিমান, ভয়াবহ দুর্ঘটনায় নিহত ৯
‘হায় ঈশ্বর! আমাদের হাতে আর সময় নেই।’ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে নিয়ন্ত্রণকক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের সময় এমনই আতঙ্কিত কণ্ঠ শোনা যায় এক নারী ক্রু সদস্যের। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে একটি ব্যক্তিগত জেট উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার আগে পাইলট ও নিয়ন্ত্রণকক্ষের কর্মকর্তার কথোপকথনের অডিও প্রকাশের পর সামনে এসেছে দুর্ঘটনার ভয়াবহ শেষ মুহূর্তগুলো।
রোববার (০১ নভেম্বর) বিকেলে পাম বিচ শহরের ক্রেসহ্যাভেন এলাকার একটি আবাসিক এলাকায় লিয়ারজেট-৬০ মডেলের উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হয়। এতে চালকসহ ৯ জন নিহত হন। দুর্ঘটনাস্থল থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত বাসভবন মার-এ-লাগোর দূরত্ব মাত্র ৯ মাইল বা প্রায় ১৪ দশমিক ৪৮ কিলোমিটার।
প্রকাশিত অডিওতে শোনা যায়, দুর্ঘটনার আগে পাইলট প্রথমে মাঝারি মাত্রার ঝাঁকুনি এবং উড়োজাহাজের ডানায় সামান্য স্বচ্ছ বরফ জমার কথা জানান। তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।
একপর্যায়ে পাইলট জরুরি বিপৎসংকেত পাঠিয়ে বলেন, “আমরা ৮ হাজার ফুট নিচে নামছি—মেডে, মেডে—প্রতি মিনিটে ১০ হাজার ফুট নিচে নামছি।”
এরপর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
পাইলটকে বলতে শোনা যায়, “আমরা নিয়ন্ত্রণের অতিরিক্ত গতিতে রয়েছি, প্রতি মিনিটে ২০ হাজার ফুট নিচে নামছি।” এরপর তিনি চিৎকার করে বলেন, “আমরা মাটিতে আছড়ে পড়তে যাচ্ছি।”
এ সময় নিয়ন্ত্রণকক্ষের কর্মকর্তা বলেন, “নভেম্বর টু ব্রাভো ডেল্টা, আমি আপনার সঙ্গে আছি। আমার সঙ্গে কথা বলুন।”
জবাবে ক্রু সদস্য জানান, “আমরা ২২ হাজার ফুট নিচে নামছি এবং ৬০ ডিগ্রি কোণে কাত হয়ে যাচ্ছি... বাইরে তাকান।” এর পরপরই এক নারী ক্রু সদস্যকে চিৎকার করে বলতে শোনা যায়, “হায় ঈশ্বর! আমাদের হাতে আর সময় নেই।”
টেক্সাসের অস্টিন থেকে বাহামাসের নর্থ এলিউথেরা বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করেছিল প্রায় ২০ লাখ ডলার মূল্যের ব্যক্তিগত জেটটি। পথে গ্রিনএকার্সের একটি ভ্রাম্যমাণ আবাসন এলাকায় বিধ্বস্ত হয় এটি। বিমান চলাচল পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, বিকেল ৩টা ৩৭ মিনিটে যাত্রা শুরু করা উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হওয়ার আগে ৪১ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়ছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, আকাশ থেকে দ্রুত নিচে নেমে আসছে উড়োজাহাজটি। মুহূর্তের মধ্যে মাটিতে আছড়ে পড়ে সেটি। এরপরই সৃষ্টি হয় বিশাল অগ্নিগোলক। বিস্ফোরণের তীব্রতায় মাটিতে বড় গর্ত তৈরি হয়। দুর্ঘটনার সময় একটি গাছের সঙ্গে ধাক্কা লাগে উড়োজাহাজটির। ছিঁড়ে পড়ে বিদ্যুতের তারও। বিকট শব্দে বিস্ফোরণের ঘটনাকে একজন প্রত্যক্ষদর্শী ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরণের সঙ্গে তুলনা করেন।
দুর্ঘটনাস্থলে উড়োজাহাজটির ধ্বংসাবশেষের পাশাপাশি একটি ভ্রাম্যমাণ বাড়িও দেখা যায়। ওয়েস্ট পাম বিচের একটি বিমানবন্দর থেকে প্রায় ৪ মাইল দক্ষিণে এই দুর্ঘটনাস্থল। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্ঘটনার এক ঘণ্টারও বেশি সময় আগে ওই বিমানবন্দর থেকেই উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার স্থান ত্যাগ করেন ট্রাম্প।
এদিকে, দুর্ঘটনার পরপরই উড়োজাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জরুরি সেবাদানকারী দল কাজ শুরু করে। ক্রেস্টহ্যাভেন বুলেভার্ড ও ১০ম অ্যাভিনিউ নর্থের মধ্যবর্তী মিলিটারি ট্রেইল সড়কটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। সাধারণ মানুষকে দুর্ঘটনাস্থল এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয় কর্তৃপক্ষ।
পাম বিচ কাউন্টি ফায়ার সার্ভিস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানায়, দুর্ঘটনার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। এ কারণে সবাইকে ওই এলাকা এড়িয়ে চলার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়্যার অঙ্গরাজ্যের উইলমিংটনভিত্তিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এলআর৬০২৭১ এলএলসির নামে নিবন্ধিত ছিল উড়োজাহাজটি। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে যৌথ তদন্ত করবে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) ও ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড (এনটিএসবি)। তদন্তের নেতৃত্ব দেবে এনটিএসবি। দুর্ঘটনার কারণ ও বিস্তারিত তথ্য পরবর্তী সময়ে প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছে এফএএ।
সূত্র: নিউইয়র্ক পোস্ট ও সিএনএন
এসি//