রাজধানী

‘তুমি পৃথিবীতে নাই, আমিও বাঁচব না’—চিরকুট রেখে ঢামেকের বাথরুমে তরুণীর মৃত্যু

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বাথরুম থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া তরুণীর পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। তার নাম তন্ময়ী মণ্ডল, বয়স ২৮ বছর। তিনি রাজধানীর ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

সোমবার (০৫ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১১০ ও ১১১ নম্বর ওয়ার্ডের মাঝামাঝি একটি বাথরুম থেকে অজ্ঞাতপরিচয় ওই তরুণীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে বিকেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে গিয়ে স্বজনরা তাকে তন্ময়ী মণ্ডল হিসেবে শনাক্ত করেন।

তন্ময়ীর বাড়ি বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার ঐচার মাঠ গ্রামে। তার বাবা মৃত বিভূত মণ্ডল। দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন বড়। ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে নার্স হিসেবে কর্মরত তন্ময়ী আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের হোস্টেলে থাকতেন।

তন্ময়ীর ছোট বোন তন্দ্রা মণ্ডল জানান, প্রায় এক বছর আগে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার মাখন মিত্রের ছেলে আকাশ মিত্রের সঙ্গে তন্ময়ীর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে বসবাসকারী আকাশ বিবাহিত ছিলেন। শুরুতে এ বিষয়টি তন্ময়ী জানতেন না। পরে বিষয়টি জানার পর আকাশ তার স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার কথা বলেছিলেন। এ নিয়ে তার সংসারেও নানা জটিলতা চলছিল।

তন্দ্রা জানান, রোববার বিকেলে আকাশ আত্মহত্যা করেছেন বলে খবর পান তন্ময়ী। আকাশের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হলে তন্ময়ী সেখানে চলে যান। পরদিন হাসপাতালের বাথরুম থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার এসআই রফিকুল ইসলাম জানান, আর্থিক সংকট ও ঋণের কারণে আকাশ মিত্র মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। রোববার তিনি আত্মহত্যা করেন। মৃত্যুর আগে লেখা একটি চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘পৃথিবী ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না, কিন্তু টাকা নেই।’

চিঠিতে তন্ময়ীর কাছে টাকা পাওয়ার কথাও উল্লেখ করেছিলেন আকাশ। তবে টাকার পরিমাণ জানানো হয়নি। নিজের মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নন বলেও চিঠিতে উল্লেখ করেন তিনি।

শাহবাগ থানার এসআই মাহফুজা আক্তার জানান, প্রেমঘটিত বিষয়কে কেন্দ্র করে তন্ময়ী আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।

শাহবাগ থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান জানান, সকালে হাসপাতাল ক্যাম্প পুলিশের কাছ থেকে খবর পেয়ে ঢামেক হাসপাতালের একটি বাথরুম থেকে তরুণীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার বাম কবজিতে কাটার দাগ পাওয়া গেছে। ঘটনাস্থলের পাশে থাকা একটি ব্যাগ থেকে চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে। সেখানে লেখা ছিল, ‘তুমি পৃথিবীতে নাই, আমিও বাঁচব না।’

বিকেলে স্বজনরা মরদেহ শনাক্ত করেন। পরে পুলিশ জানতে পারে, তন্ময়ীর সঙ্গে সম্পর্ক থাকা আকাশ মিত্রও আত্মহত্যা করেছিলেন। তার মৃত্যুর পর তন্ময়ী আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ।

এদিকে তন্ময়ীর মরদেহ উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টা আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রশাসনিক ভবনের কনফারেন্স কক্ষের দ্বিতীয় প্রবেশপথের সামনে রক্তমাখা একটি কালো ইস্পাতের ছুরি পাওয়া যায়। সকাল সাড়ে ৬টার দিকে পরিচ্ছন্নতাকর্মী কাশী সন্তোষ প্রথম ছুরিটি দেখতে পান।

কাশী সন্তোষ জানান, ছুরিটি পড়ে থাকতে দেখে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে তিনি ওই স্থান পরিষ্কার করেন। পরে ছুরিটি ধুয়ে নিজের কাছে রাখেন। কয়েক ঘণ্টা পর ১১০ ও ১১১ নম্বর ওয়ার্ডের বাথরুমে এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের খবর পান তিনি। তবে ওই নারীকে তিনি সরাসরি দেখেননি।

ঢামেক হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. শায়লা ফেরদৌস আহসান জানান, সকালে হাসপাতালে এসে বাথরুমে ঝুলন্ত অবস্থায় এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের খবর পান তিনি। পরে কনফারেন্স কক্ষের সামনে রক্তের দাগ ও ছুরি পড়ে থাকার বিষয়টিও জানতে পারেন।

তিনি বলেন, সকাল ৮টার আগে দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় আনসার সদস্যরা কনফারেন্স কক্ষের সামনে রক্তমাখা ছুরিটি দেখতে পান। পরে স্টাফ ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে ডেকে জায়গাটি পরিষ্কার করতে বলা হয়। হাসপাতালে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী আসায় বিভিন্ন কারণে মেঝেতে রক্ত পড়ে থাকায় শুরুতে বিষয়টি আলাদাভাবে গুরুত্ব পায়নি।

সহকারী পরিচালক আরও বলেন, কনফারেন্স কক্ষের দ্বিতীয় গেটের সামনে ফোঁটা ফোঁটা রক্তের দাগ পাওয়া যায়। ওই এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম ফরহাদ হোসাইন বলেন, পুরো বিষয়টি পুলিশ তদন্ত করছে। পাশাপাশি সিসিটিভি ফুটেজও যাচাই করা হচ্ছে। ফুটেজে তন্ময়ীকে হাসপাতালের ভেতরে একা হাঁটতে দেখা গেছে। তবে বাথরুমে প্রবেশের পর কী ঘটেছে, তা ক্যামেরার আওতায় ছিল না।

তিনি বলেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

পুলিশ জানিয়েছে, তন্ময়ীর মৃত্যুর ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তার মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে বাথরুমে যাওয়ার আগের গতিবিধি, উদ্ধার হওয়া চিরকুট, রক্তমাখা ছুরি এবং সিসিটিভি ফুটেজসহ সংশ্লিষ্ট সব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন