যুদ্ধ-নিষেধাজ্ঞায় ইরানে ওষুধের দাম আকাশছোঁয়া, রোগীরা বিপাকে
যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ, কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের প্রভাবে ইরানের ওষুধ সরবরাহব্যবস্থা বড় ধরনের চাপে পড়েছে। দেশটির ফার্মেসিগুলোতে কিছু ওষুধ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে, আবার যেসব ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে সেগুলোর অনেকগুলোর দামও বেড়েছে কয়েক গুণ। ফলে চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে রোগী ও তাদের পরিবারকে বাড়তি আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের সাত মাসের মধ্যে ইরানের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও আরও কঠিন হয়েছে। বেকারত্ব বেড়েছে, দেশটির মুদ্রার মান রেকর্ড পর্যায়ে নেমে অর্ধেকে ঠেকেছে। একই সময়ে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ওষুধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো আমদানিনির্ভরতা। সরকারি হিসাবে ইরানের ৮০ শতাংশের বেশি ওষুধ দেশে উৎপাদিত হলেও এসব ওষুধ তৈরিতে প্রয়োজনীয় অনেক কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। যুদ্ধের আগে সমুদ্রপথে ওষুধ ও ওষুধ তৈরির উপকরণের বড় অংশ দেশে আনা হতো। কিন্তু নৌ-অবরোধের কারণে সেই সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে।
তেহরানের একটি ওষুধবিষয়ক সংগঠনের সদস্য বাহমান সাবুর স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানান, সমুদ্রপথে পণ্য আনা কঠিন হয়ে পড়ার পর আমদানিকারকদের ব্যয়বহুল আকাশপথে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। কিন্তু ইরানের কয়েকটি বিমান সংস্থার ওপর নতুন করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ হওয়ায় সেই পথও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এর ফলে কিছু আন্তর্জাতিক ফ্লাইটও বন্ধ হয়েছে।
শুধু পরিবহনব্যবস্থাই নয়, আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনও ওষুধ আমদানিতে বড় বাধা তৈরি করছে।
যুক্তরাজ্যের এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেজা মাজেদজাদেহ বলেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞাগুলো সরাসরি ওষুধ আমদানিকে লক্ষ্য না করলেও দীর্ঘদিনের আর্থিক নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও কোম্পানিগুলো ইরানের সঙ্গে লেনদেনে ঝুঁকি নিতে চাইছে না।
তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে ইরানে ওষুধ বিক্রি করা আইনগতভাবে বৈধ হলেও ব্যাংক অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে। একইভাবে ওষুধ বা পরিবহন প্রতিষ্ঠানও নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এড়াতে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ফলে কাগজে লেনদেন বৈধ থাকলেও বাস্তবে সরবরাহ আটকে যাচ্ছে।
এর প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে সাধারণ ফার্মেসিগুলোতে।
তেহরানের বাসিন্দা ও পেশায় ওয়েল্ডার গোলামরেজা রহমানি এবং তার স্ত্রী সম্প্রতি ১২ বছর বয়সী মেয়ের জন্য চিকিৎসকের দেওয়া চারটি ওষুধ সংগ্রহ করতে দুই দিন ধরে একাধিক ফার্মেসিতে ঘুরেছেন। মেয়েটি পেটের সমস্যায় ভুগছিল।
রহমানি জানান, একেকটি ফার্মেসিতে একটি বা দুটি ওষুধ পাওয়া গেলেও সবগুলো একসঙ্গে পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত একটি ওষুধ কোথাও খুঁজে পাননি তারা। ওষুধের খোঁজে দুই দিন ঘুরতে গিয়ে তাকে কাজে যেতে না পারায় মজুরিও হারাতে হয়েছে।
হাসপাতালগুলোতে এখনো বড় ধরনের ওষুধ সংকটের স্পষ্ট চিত্র না মিললেও সাধারণ ফার্মেসিতে ঘাটতি বাড়ছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেশজুড়ে শত শত ওষুধের সরবরাহে ঘাটতির কথা উঠে এসেছে। ক্যানসার, দীর্ঘমেয়াদি রোগ ও অন্যান্য গুরুতর অসুস্থতার চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু ওষুধও সংকটের মধ্যে রয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব।
ইরানি কর্মকর্তাদের হিসাবে, বিমান হামলায় ৪০টির বেশি ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে কিছু ওষুধের উৎপাদনও ব্যাহত হয়েছে।
অন্যদিকে নগদ অর্থের সংকট ও বীমা কোম্পানির বকেয়া অর্থও ফার্মেসিগুলোর ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
ইরানের সংসদীয় স্বাস্থ্য কমিটির সদস্য মোহাম্মদ জামালিয়াট জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বীমা কোম্পানিগুলো ফার্মেসির পাওনা পরিশোধে নয় মাস পর্যন্ত পিছিয়ে পড়েছে। ফলে ওষুধ কিনে মজুত রাখার সক্ষমতাও অনেক ফার্মেসির কমে গেছে।
সব মিলিয়ে যুদ্ধ, নৌ-অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা, আমদানি ব্যাহত হওয়া, মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও বকেয়া অর্থ—একাধিক সংকট একসঙ্গে ইরানের ওষুধ সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করেছে। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে এমন রোগীদের ওপর, যাদের নিয়মিত ওষুধ ছাড়া চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন।
সূত্র: এপি
এসি//