এআই যখন নিজেই হ্যাকার!
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে এতদিন আমরা দেখেছি প্রশ্নের উত্তর দিতে, তথ্য খুঁজে দিতে কিংবা মানুষের হয়ে লেখা ও বিশ্লেষণের কাজ করতে। কিন্তু এআই যদি শুধু নির্দেশ পালন না করে, নিজেই ইন্টারনেটে তথ্য খুঁজে কোনো কম্পিউটার ব্যবস্থায় ঢোকার চেষ্টা করে—তখন বিষয়টি আর সাধারণ প্রযুক্তি ব্যবহারের মধ্যে থাকে না।
গুগলের এআই মডেল ‘জেমিনি’র সাম্প্রতিক এক পরীক্ষায় ঠিক এমন ঘটনাই ঘটেছে। সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা যাচাইয়ের সময় জেমিনি ইন্টারনেটে গিয়ে তথ্য খুঁজে বের করে এবং তিনটি প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষিত ব্যবস্থায় প্রবেশ করে। এটিকে গুগলের এআই ব্যবস্থার স্বয়ংক্রিয়ভাবে এ ধরনের কাজ করার প্রথম জানা ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঘটনাগুলো ঘটে চলতি বছরের মে মাসে। সাইবার নিরাপত্তা মূল্যায়নকারী স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ‘ইরেগুলার’ পরীক্ষাটি পরিচালনা করে। পরীক্ষার সময় জেমিনি অনলাইনে থাকা প্রকাশ্য তথ্য খুঁজে নেয়। এরপর পরীক্ষার আওতাভুক্ত বলে মনে করা তিনটি ওয়েবসাইটে প্রবেশের জন্য কিছু প্রবেশ-তথ্য অনুমান করে।
গুগলের নিরাপত্তা প্রকৌশল বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিদার অ্যাডকিনস জানান, ঘটনাগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট তিন প্রতিষ্ঠানকে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি পরীক্ষাটি পরিচালনাকারী অংশীদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করে তাদের পরীক্ষার পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
গুগলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তিনটি ঘটনাতেই জেমিনি একপর্যায়ে নিজে থেকে ওই ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।
কীভাবে ঢুকেছিল জেমিনি?
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রথম ঘটনাটি প্রকাশ করে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনটি ঘটনার একটিতে জেমিনি বারবার পাসওয়ার্ড অনুমান করতে থাকে। একপর্যায়ে সুরক্ষিত একটি ব্যবস্থায় প্রবেশ করতে সক্ষম হয়।
অন্য দুটি ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল কিছুটা ভিন্ন। জেমিনি একটি উন্মুক্ত অনলাইন ভান্ডারে থাকা প্রবেশ-তথ্য খুঁজে পায়। সেই তথ্য ব্যবহার করেই পরে সুরক্ষিত ব্যবস্থায় ঢোকার সুযোগ তৈরি হয়।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জেমিনিকে সরাসরি কোনো প্রতিষ্ঠানের সাইবার ব্যবস্থা ভাঙার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল—এমন তথ্য নেই। বরং একটি নির্দিষ্ট সাইবার নিরাপত্তা পরীক্ষার অংশ হিসেবে কাজ করার সময় মডেলটি নিজে তথ্য খুঁজে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়েছিল।
এই স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের জন্য সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
শুধু জেমিনি নয়
এ ধরনের ঘটনা এবারই প্রথম সামনে এলো, তা নয়। ইরেগুলারের সঙ্গে পরিচালিত পরীক্ষাকে ঘিরে মেটা, অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআইয়ের এআই ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘটনার তথ্য প্রকাশ পেয়েছে।
আগস্টে মেটা জানায়, তাদের এআই মডেলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ঘটনায় পরীক্ষার নির্ধারিত পরিবেশ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা বা অত্যাধুনিক সাইবার হামলার মতো কিছু ঘটেনি। অন্যদিকে ইরেগুলার জানিয়েছে, এআইয়ের সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা পরীক্ষা নিরাপদভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ভালো পদ্ধতি তৈরিতে তারা কাজ করছে।
ইরেগুলারের এক মুখপাত্র জানান, ঘটনাগুলোতে যে সমস্যা শনাক্ত হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট সব এআই গবেষণাগারকে জুলাইয়ের শেষ দিকে তা জানানো হয়। তাদের পক্ষ থেকে চিহ্নিত সব সমস্যা কয়েক সপ্তাহ আগেই সমাধান করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এআই এজেন্ট নিয়ে কেন এত আলোচনা?
এআই প্রযুক্তির নতুন পর্যায়ে ‘এআই এজেন্ট’ শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সাধারণ এআই কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পর থেমে যায়। কিন্তু এআই এজেন্টকে একটি লক্ষ্য দিলে সে লক্ষ্য পূরণের জন্য একাধিক ধাপে কাজ করতে পারে।
তথ্য খোঁজা, বিভিন্ন উৎস যাচাই করা, প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করা এবং পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার মতো কাজও এ ধরনের ব্যবস্থার অংশ হতে পারে।
ইন্টারনেট ও কম্পিউটার ব্যবস্থায় সরাসরি প্রবেশের সুযোগ পেলে এই সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হয়। তবে একই সঙ্গে বাড়ে ঝুঁকিও।
একটি এআই ব্যবস্থা যদি অনলাইনে থাকা প্রকাশ্য তথ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশ-তথ্য খুঁজে বের করতে পারে, পাসওয়ার্ড অনুমান করতে পারে এবং সুরক্ষিত ব্যবস্থায় প্রবেশের চেষ্টা করতে পারে, তাহলে তাকে কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া উচিত—সেই প্রশ্ন সামনে আসছে।
সুবিধা ও ঝুঁকি দুটোই
সাইবার নিরাপত্তায় এআইয়ের ব্যবহার অবশ্যই বড় সম্ভাবনা তৈরি করছে। বিপুল পরিমাণ তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করে নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা শনাক্ত করা, সন্দেহজনক কার্যক্রম খুঁজে বের করা কিংবা সম্ভাব্য হামলার আগেই সতর্ক করার ক্ষেত্রে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কিন্তু একই প্রযুক্তি ভুল হাতে পড়লে বা যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া কাজ করলে ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে এআই যখন মানুষের প্রতিটি নির্দেশের জন্য অপেক্ষা না করে নিজেই একাধিক ধাপে কাজ করার সক্ষমতা অর্জন করছে।
জেমিনির ঘটনাগুলো তাই শুধু একটি পরীক্ষার ফলাফল নয়; বরং এআইয়ের ভবিষ্যৎ ব্যবহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এনেছে।
প্রশ্নটি এখন শুধু এআই কতটা বুদ্ধিমান হতে পারবে, তা নয়। বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—এআইকে কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হবে এবং সেই স্বাধীনতার সীমা কোথায় থাকবে।
গুগলের হিদার অ্যাডকিনসের মতে, শক্তিশালী এআই মডেলকে দায়িত্বশীলভাবে কাজ করার প্রশিক্ষণ দেওয়ার গুরুত্ব এসব ঘটনা আবারও সামনে এনেছে।
এআই যত বেশি মানুষের হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং কাজ করার দিকে এগোবে, ততই এর সঙ্গে যুক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করতে হবে। কারণ ভবিষ্যতের প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় শুধু বেশি সক্ষম এআই তৈরি করাই লক্ষ্য নয়; সেই সক্ষমতাকে নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত রাখাও হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
সূত্র: রয়টার্স
এসি//