ডোবা থেকে উদ্ধার সুটকেসে নারীর দ্বিখণ্ডিত মরদেহ, বেরিয়ে এল হত্যার লোমহর্ষক তথ্য
গত ১১ সেপ্টেম্বর বিকেলে জয়দেবপুর থানাধীন ভবানীপুর এলাকার হামজা অ্যাপারেলস লিমিটেডের উত্তর পাশে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পশ্চিম পাশের খালের পানিতে একটি সুটকেস ও গাজীপুরের জয়দেবপুরে ডোবার পানিতে সুটকেস ও প্লাস্টিকের বস্তা থেকে নারীর দ্বিখণ্ডিত ও অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে পুলিশ। পাঁচ বছরের প্রেমের সম্পর্ক, বিয়ে নিয়ে বিরোধ এবং দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকেই ডলি আক্তার নামে ৩০ বছর বয়সী ওই নারীকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তার প্রেমিক মিশন ইসলামের বিরুদ্ধে।
পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, হত্যার পর পরিচয় গোপন এবং মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে বটি, দা ও ব্লেড দিয়ে কোমর থেকে ডলির মরদেহ দুই টুকরো করা হয়। পরে মরদেহের একাংশ সুটকেসে এবং অন্য অংশ প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে খালের পানিতে ফেলে দেওয়া হয়।
চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন—পিবিআই, গাজীপুর জেলা। ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে মিশন ইসলাম, তার মা বানু আক্তার এবং সহযোগী মিজানুর রহমান মিল্টনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার তিনজনই আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পিবিআই।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) গাজীপুর জেলা পিবিআই কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তার।
পুলিশ সুপার জানান, নিহত ডলি আক্তার ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থানার পাহাড়পাবিজান গ্রামের বাদশা মিয়ার মেয়ে। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর তিনি গাজীপুরে বসবাস করছিলেন। জয়দেবপুর থানার বানিয়ারচালা মেম্বারবাড়ি এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় একাই থাকতেন ডলি। জীবিকার জন্য বাঘের বাজার এলাকার গোল্ডেন রিপিট গার্মেন্টসে সুইং অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন তিনি।
পিবিআই জানিয়েছে, গত ১১ সেপ্টেম্বর বিকেলে জয়দেবপুর থানাধীন ভবানীপুর এলাকার হামজা অ্যাপারেলস লিমিটেডের উত্তর পাশে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পশ্চিম পাশের খালের পানিতে একটি সুটকেস ও প্লাস্টিকের বস্তা ভাসতে দেখা যায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সুটকেসের ভেতর ও বস্তায় রাখা এক নারীর খণ্ডিত ও অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে। পরে অজ্ঞাত নারীর দ্বিখণ্ডিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাটি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে পিবিআই গাজীপুর জেলা স্বতঃপ্রণোদিতভাবে ছায়া তদন্ত শুরু করে। পিবিআইয়ের ক্রাইমসিন টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ, গোয়েন্দা তথ্য ও বিশ্বস্ত স্থানীয় সোর্সের সমন্বয়ে শুরু হয় নিবিড় অনুসন্ধান। তদন্তের একপর্যায়ে শনাক্ত হয় নিহত নারীর পরিচয়। একই সঙ্গে উন্মোচিত হয় হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের ঘটনাও।
পিবিআইয়ের তদন্ত ও আসামিদের আদালতে দেয়া জবানবন্দি অনুযায়ী, ডলি আক্তারের সঙ্গে মিশন ইসলামের প্রায় ৫ বছর ধরে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। একই গার্মেন্টসে চাকরির সুবাদে তাদের পরিচয় হয়। ডলি প্রায়ই মিশনের ভাড়াবাসায় যাতায়াত করতেন। গত ৮ সেপ্টেম্বর রাতে ডলি মিশনের ভাড়াবাসায় যান। সেখানে মিশন, তার মা বানু আক্তার ও ডলি একসঙ্গে রাতের খাবার খান। পরে বানু আক্তার পাশের কক্ষে ঘুমাতে গেলে মিশন ও ডলি একই কক্ষে অবস্থান করেন। পিবিআই জানায়, পূর্বের বিভিন্ন বিষয় ও বিয়ে সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে মিশনের মনে ক্ষোভ তৈরি হয়। একপর্যায়ে ডলিকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় সে।
আসামির জবানবন্দি অনুযায়ী, ওই রাতে ডলিকে ঘুমের ওষুধ ও অ্যালার্জির ওষুধ খাওয়ানো হয়। তিনি ঘুমিয়ে পড়লে রাত আনুমানিক ২টার দিকে মিশন লুঙ্গি দিয়ে তার গলায় পেঁচিয়ে এবং পরে বালিশ দিয়ে মুখ চেপে শ্বাসরোধে হত্যা করে। এরপর লাশটি চৌকির নিচে লুকিয়ে রাখে। পরদিন সকালে ঘর পরিষ্কার করার সময় বানু আক্তার চৌকির নিচে ডলির মরদেহ দেখতে পান। এরপর মরদেহ গুমের পরিকল্পনা করা হয়। মিশন একটি সুটকেস সংগ্রহ করে। কিন্তু পুরো মরদেহ সুটকেসে না ধরায় ব্লেড ও বটি দা দিয়ে কোমর থেকে দ্বিখণ্ডিত করা হয়।
মরদেহের একাংশ সুটকেসে এবং অপরাংশ পলিথিনে মুড়িয়ে প্লাস্টিকের বস্তায় রাখা হয়। পরে মিশন তার বন্ধু মিজানুর রহমান মিল্টনকে বাসা পরিবর্তনের কথা বলে ডেকে আনে। মিল্টন এসে সুটকেস ও বস্তা অটোরিকশায় তুলে দিতে সহযোগিতা করে। পরে মিশন, তার মা বানু আক্তার ও মিল্টন মিলে সুটকেস ও বস্তা নিয়ে প্রথমে রাজেন্দ্রপুর এবং সেখান থেকে সিএনজি অটোরিকশাযোগে ভবানীপুর এলাকায় যায়। ভবানীপুর ব্রিজ এলাকা থেকে মিশন ও মিল্টন সুটকেস ও বস্তা খালের পানিতে ফেলে দেয়। এ সময় মিল্টনের হাতে রক্ত লাগলে সুটকেস ও বস্তার ভেতরে কী রয়েছে জানতে চায় সে। একপর্যায়ে মিশন তাকে জানায়, সেখানে তার প্রেমের সম্পর্ক থাকা ডলি আক্তারের মরদেহ রয়েছে। পরে তারা নিজ নিজ বাসায় ফিরে যায়।
নিহতের বড় ভাই সোহেল (৪৪) বাদী হয়ে ১২ সেপ্টেম্বর জয়দেবপুর থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা ও মরদেহ গুমের অভিযোগে মামলা করেন। মামলাটি তদন্তে নিয়ে পিবিআই দ্রুত সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করে।
পরবর্তীতে ১২ সেপ্টেম্বর গাজীপুর মহানগরের সদর মেট্রো থানাধীন বাহাদুরপুর তুলসীভিটা এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে মিজানুর রহমান মিল্টনকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই দিন বিকেলে পৃথক ভাড়া বাসা থেকে মিশন ইসলাম ও তার মা বানু আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আসামিদের দেয়া তথ্য মিশনের ভাড়া বাসা থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি বটি দা, লাশ প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত স্কচটেপের অবশিষ্টাংশ, নিহত ডলি আক্তারের জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যবহৃত বাটন মোবাইল ফোন ও এক জোড়া জুতা উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি সুটকেস কেনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে পিবিআই।
পিবিআই গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তার জানান, মরদেহটি অজ্ঞাত ও অর্ধগলিত অবস্থায় উদ্ধারের কারণে শুরুতে পরিচয় শনাক্ত করা বেশ কঠিন ছিল। তবে ক্রাইমসিন বিশ্লেষণ, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য ও বিশ্বস্ত সোর্সের সমন্বিত ব্যবহারে শেষ পর্যন্ত নিহতের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।
এসি//