নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটে চালু হচ্ছে বৈদ্যুতিক ট্রেন
বাংলাদেশের রেলপথে শুরু হতে যাচ্ছে নতুন অধ্যায়। প্রথমবারের মতো নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রায় ৫২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু হলে রাজধানী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলের যাতায়াত ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য আগামী বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি—একনেকের সভায় উপস্থাপন করা হবে। এর বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮২৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক—এডিবি এবং ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক—ইআইবি উন্নয়ন সহায়তা হিসেবে দেবে ২ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২০৩১ সালের ৩০ জুন।
বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রেনগুলো মূলত ডিজেলচালিত ইঞ্জিনের ওপর নির্ভরশীল।
সরকারি নথিতে বলা হয়েছে, বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু হলে জ্বালানি ব্যবহারে প্রায় ৪০ শতাংশ সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি ট্রেনের গতিও বাড়বে।
প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ঢাকা এবং এর দুই পাশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের মধ্যে দ্রুত যাতায়াতের জন্য এই রেলপথ গুরুত্বপূর্ণ গণপরিবহন সংযোগ হিসেবে কাজ করতে পারে। পুরোনো ডিজেল ইঞ্জিনের কারণে বর্তমানে ট্রেনগুলো নির্ধারিত গতিতে চলতে পারে না। যাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত ট্রিপ পরিচালনাও সম্ভব হয় না।
এই সীমাবদ্ধতা দূর করতেই বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর প্রকল্প হাতে নিয়েছে রেলওয়ে। এটি বাস্তবায়িত হলে প্রতিদিন গাজীপুর, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের মধ্যে চলাচলকারী হাজারো যাত্রী দ্রুত, নিরাপদ ও তুলনামূলক কম খরচে যাতায়াতের সুযোগ পাবেন।
প্রকল্পের আওতায় পুরো রেল পরিচালনা ব্যবস্থা ডিজেল থেকে বিদ্যুতে রূপান্তর করা হবে। এজন্য রেললাইনের ওপর স্থাপন করা হবে বিদ্যুৎ সরবরাহের তার বা ওভারহেড ওয়্যার। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট দূরত্বে নির্মাণ করা হবে ট্র্যাকশন সাবস্টেশন।
এ ছাড়া নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন ট্রেন চলাচলের জন্য আধুনিক ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট বা ইএমইউ ট্রেন, বৈদ্যুতিক ইঞ্জিন এবং কম্পিউটারনির্ভর স্বয়ংক্রিয় সংকেতব্যবস্থা স্থাপন করা হবে।
প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু হলে রেল যোগাযোগের পাশাপাশি অর্থনীতি ও পরিবহন ব্যবস্থাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ডিজেলচালিত ট্রেনের তুলনায় বৈদ্যুতিক ট্রেন দ্রুত গতি তুলতে এবং দ্রুত থামতে পারে। ফলে স্টেশনে যাত্রাবিরতির পর অল্প সময়েই কাঙ্ক্ষিত গতিতে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
এর ফলে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটে যাতায়াতের সময় অর্ধেকেরও বেশি কমে আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রায় ৩ হাজার ৯৩ কিলোমিটার রেল নেটওয়ার্কে ডিজেলচালিত ট্রেন চলছে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও রেলওয়ের কর্মকর্তাদের মতে, বৈদ্যুতিক রেলব্যবস্থায় শুরুতে বিনিয়োগ বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কম। একই সঙ্গে এটি তুলনামূলকভাবে নির্ভরযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব।
কর্মকর্তাদের হিসাবে, বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু হলে পরিচালন ব্যয় প্রায় ৩৫ শতাংশ এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমার সম্ভাবনা রয়েছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ।
বৈদ্যুতিক রেলব্যবস্থার উদাহরণ হিসেবে ভারতের রেলওয়ের তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে প্রকল্প প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ভারতের ৬৫ হাজার ৩০০ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেলপথের প্রায় ৯০ শতাংশ, অর্থাৎ ৫৮ হাজার ৮১২ কিলোমিটার বিদ্যুতায়িত হয়েছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটেও বৈদ্যুতিক ট্রেনের পরিকল্পনা
নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটের পাশাপাশি ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথেও বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
গত ৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে বৈদ্যুতিক ট্রাকশন চালুর জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিস্তারিত নকশার কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।
সাংসদ মোহাম্মদ এনামুল হকের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রকল্পটির অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার পর বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে।
এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটেও বৈদ্যুতিক ট্রেন চলাচলের সুযোগ তৈরি হবে। এতে ট্রেনের গড় গতি বাড়ার পাশাপাশি দুই শহরের মধ্যে যাতায়াতের সময়ও কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এসি//