আন্তর্জাতিক

জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনে লড়াইয়ে ৮ প্রার্থী

জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব কে হবেন—এ নিয়ে শুরু হয়েছে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আগামী ১ জানুয়ারি নতুন মহাসচিব দায়িত্ব নেবেন। এবারের দৌড়ে এখন পর্যন্ত আলোচনায় রয়েছেন লাতিন আমেরিকার একাধিক প্রার্থী। পাশাপাশি জাতিসংঘের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন নারীকে মহাসচিব করার দাবিও জোরালো হয়েছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, ভৌগোলিক ভারসাম্যের কারণে এবার লাতিন আমেরিকা থেকে মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সাধারণত বিভিন্ন মহাদেশের মধ্যে পালাক্রমে এই পদ বণ্টনের প্রবণতা দেখা যায়। লাতিন আমেরিকা থেকে সর্বশেষ মহাসচিব ছিলেন পেরুর হাভিয়ের পেরেজ দে কুয়েলার। ১৯৯২ সালে তিনি দায়িত্ব ছাড়েন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ৮০ বছরেও কোনো নারী মহাসচিবের দায়িত্ব পাননি। তাই এবার একজন নারীকে এই শীর্ষ পদে আনার দাবি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে।

তবে নতুন মহাসচিব এমন এক সময়ে দায়িত্ব নেবেন, যখন জাতিসংঘ নিজেই নানা সংকটে রয়েছে। সংস্থাটির সবচেয়ে বড় অর্থদাতা যুক্তরাষ্ট্র স্বেচ্ছা তহবিলে অর্থায়ন কমিয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে বেরিয়ে গেছে দেশটি। সদস্য দেশগুলোর বকেয়া চাঁদা ও অর্থসংকটের কারণে জাতিসংঘের তারল্য পরিস্থিতিও কঠিন হয়ে পড়েছে।

গুতেরেসের মেয়াদে গাজা ও সুদানের সংঘাত কিংবা ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। ফলে নতুন মহাসচিবের সামনে সংস্থাটিকে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করার বড় চ্যালেঞ্জ থাকবে।

যেভাবে নির্বাচিত হন মহাসচিব

পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০২৫ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতিরা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীদের মনোনয়ন আহ্বান করেন।

জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী, ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদ একজন প্রার্থীকে সুপারিশ করে। এরপর ১৯৩ সদস্যের সাধারণ পরিষদ সেই প্রার্থীর নিয়োগ অনুমোদন দেয়।

তবে নির্বাচনের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় নিরাপত্তা পরিষদেই। কোনো প্রার্থীকে সুপারিশ পেতে অন্তত ৯ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। পাশাপাশি নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন—কেউ ওই প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভেটো দিতে পারবে না।

প্রাথমিক পর্যায়ে গোপন ও অনানুষ্ঠানিক ভোটের মাধ্যমে প্রার্থীদের বিষয়ে সদস্যদের অবস্থান যাচাই করা হয়। সেখানে প্রার্থীদের নিয়ে তিন ধরনের মতামত দেওয়া হয়—‘উৎসাহিত’, ‘মতামত নেই’ এবং ‘নিরুৎসাহিত’।

এখন পর্যন্ত দুই দফা ভোট হয়েছে। দ্বিতীয় দফার ভোটে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন গায়ানার প্রার্থী ক্যারোলিন রড্রিগেস-বিরকেট। এরপর রয়েছেন কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান ও আর্জেন্টিনার রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি।

ক্যারোলিন রড্রিগেস-বিরকেট—গায়ানা

গায়ানার জাতিসংঘ রাষ্ট্রদূত ক্যারোলিন রড্রিগেস-বিরকেট আগে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও আদিবাসীবিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন। ২০২৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদে গায়ানার প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। ছোট দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষা, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং মানবাধিকারকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। দ্বিতীয় দফার ভোটে তার পক্ষে ৮টি ‘উৎসাহিত’ ভোট পড়ে। বিপক্ষে ‘নিরুৎসাহিত’ ভোট ছিল ৩টি এবং ‘মতামত নেই’ ছিল ৪টি। ফলে এখন পর্যন্ত তিনিই সবচেয়ে এগিয়ে থাকা প্রার্থী।

রেবেকা গ্রিনস্প্যান—কোস্টারিকা

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা ইউএনসিটিএডির মহাসচিব রেবেকা গ্রিনস্প্যান। এর আগে কোস্টারিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট ও উপ-অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ২০২২ সালের কৃষ্ণসাগর শস্য উদ্যোগ বাস্তবায়নে জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তার। মহাসচিবের কার্যালয়ে সংস্কার, মধ্যস্থতার সক্ষমতা বাড়ানো, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার দায়িত্বের পুনরাবৃত্তি কমানো এবং প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর পক্ষে তিনি। জুলাইয়ের প্রথম দফার ভোটে ১০টি ‘উৎসাহিত’ ভোট পেয়েছিলেন গ্রিনস্প্যান। তবে আগস্টের দ্বিতীয় দফায় তা কমে দাঁড়ায় ৭টিতে।

রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি—আর্জেন্টিনা

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসির রয়েছে প্রায় চার দশকের কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা। জাতিসংঘকে আরও কার্যকর করতে শান্তি ও নিরাপত্তা, উন্নয়ন, মানবাধিকার, প্রশাসনিক সংস্কার এবং বাস্তবভিত্তিক বহুপাক্ষিকতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। আগস্টের ভোটে ৭টি ‘উৎসাহিত’ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন গ্রোসি। তবে তার বিপক্ষে ‘নিরুৎসাহিত’ ভোট পড়ে ৬টি।তার প্রার্থিতার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য যুক্তরাজ্য চাইলে গ্রোসির প্রার্থিতায় ভেটো দিতে পারে।

মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা—ইকুয়েডর

ইকুয়েডরের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা ২০১৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ছিলেন। তিনি ছিলেন এই পদে দায়িত্ব নেওয়া চতুর্থ নারী এবং লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের প্রথম নারী। সংকট বড় আকার নেওয়ার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে ‘প্রতিরোধ ও আগাম পদক্ষেপ কেন্দ্র’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। তবে আগস্টের ভোটে মাত্র ৪টি ‘উৎসাহিত’ ভোট পেয়েছেন এসপিনোসা। ফলে বর্তমানে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বেশ পিছিয়ে রয়েছেন।

মিশেল ব্যাশেলে—চিলি

চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল ব্যাশেলে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ আমলাতান্ত্রিক কাঠামো সংস্কার, সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংস্থাটির যোগাযোগ বাড়ানো এবং ভবিষ্যতের সংকট মোকাবিলায় আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে তিনি। তবে আগস্টের ভোটে তার সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। তিনি পেয়েছেন মাত্র ২টি ‘উৎসাহিত’ ভোট। বিপরীতে ‘নিরুৎসাহিত’ ভোট পড়েছে ৬টি।

ম্যাকি সাল—সেনেগাল

২০১২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সেনেগালের প্রেসিডেন্ট ছিলেন ম্যাকি সাল। তার নির্বাচনি প্রচারের মূল বক্তব্য ‘নতুন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বহুপাক্ষিকতা’। জাতিসংঘের সংঘাত প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা, প্রশাসনিক কাঠামো পর্যালোচনা এবং মানবাধিকার ও উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। তবে তার সামনে বড় বাধা হিসেবে রয়েছে লাতিন আমেরিকা থেকে পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের সম্ভাবনা এবং প্রথম নারী মহাসচিব নিয়োগের দাবি।

ওলারা ওতুনু—উগান্ডা

উগান্ডার অভিজ্ঞ কূটনীতিক ওলারা ওতুনু চার দশকের বেশি সময় আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কাজ করেছেন। তিনি জাতিসংঘে উগান্ডার রাষ্ট্রদূত এবং দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। দায়িত্ব পেলে ইউক্রেন, গাজা, কঙ্গো, সুদান ও ইরানের মতো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলকে শুরু থেকেই অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। জুলাই থেকে আগস্টের মধ্যে নিরাপত্তা পরিষদের ভোটে তাঁর সমর্থন সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। তবে লাতিন আমেরিকার কোনো নারী প্রার্থী না হওয়ায় রাজনৈতিক সমীকরণে তিনি পিছিয়ে পড়তে পারেন।

ইভোনে এ-বাকি—ইকুয়েডর

ইকুয়েডরের কূটনীতিক ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ইভোনে এ-বাকি টোঙ্গার মনোনয়নে এই প্রতিযোগিতায় যুক্ত হয়েছেন। সংঘাত প্রতিরোধ এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার তার প্রার্থিতার অন্যতম প্রধান বিষয়। আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের মতো ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোকে নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব দেওয়ার পক্ষে তিনি। তবে আগস্টের ভোটে একটি ‘উৎসাহিত’ ভোটও পাননি এ-বাকি। তার বিপক্ষে ৮টি ‘নিরুৎসাহিত’ ভোট পড়ে এবং ৭টি ভোটে সদস্যরা কোনো মতামত দেননি। ফলে এখন পর্যন্ত তার প্রার্থিতাই সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে।

সামনে যে সমীকরণ

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে ঘিরে এখন প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা ও কূটনৈতিক তৎপরতা আরও বাড়বে। শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের সমর্থন বা অন্তত ভেটো না দেওয়াই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

দুই দফা অনানুষ্ঠানিক ভোটে গায়ানার ক্যারোলিন রড্রিগেস-বিরকেট এগিয়ে থাকলেও তাকেই যে শেষ পর্যন্ত নির্বাচিত করা হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। আগামী কয়েক সপ্তাহে আলোচনা, কূটনৈতিক সমঝোতা ও ভোটের সমীকরণে পরিবর্তন আসতে পারে। শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশের পর সাধারণ পরিষদের অনুমোদনেই নির্ধারিত হবে জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিবের নাম।

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন