পশ্চিমা নির্ভরতা কমাতে যুদ্ধ-শুল্কের মধ্যেই ব্রিকসের নতুন কৌশল
যুদ্ধ, বাণিজ্য শুল্ক, জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তনের নানা সমীকরণের মধ্যেই ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শুরু হয়েছে ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) শুরু হওয়া দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলন এবার বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে, কারণ একই সঙ্গে ব্রিকসের ২০ বছর পূর্তিও হচ্ছে।
সম্মেলনে চীন, রাশিয়া ও ইরানের শীর্ষ নেতারা অংশ নিয়েছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্মেলনে সভাপতিত্ব করছেন। মিশর, ইথিওপিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার নেতারাও এতে যোগ দিয়েছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিনিধিত্ব করছেন আবুধাবির যুবরাজ। আর ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভার পরিবর্তে সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাউরো ভিয়েরা।
এবারের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা বাণিজ্য শুল্ক এবং সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক মতপার্থক্য। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনে ব্যাঘাত ঘটছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতিও ব্রিকসের কয়েকটি দেশের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। এসব শুল্ক ও বাণিজ্য বাধার বিরোধিতা করেছেন জোটভুক্ত দেশগুলোর অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নররা।
সম্মেলনে পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে আন্তর্জাতিক লেনদেন বাড়ানো, নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য, দ্রুত অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেতে পারে। তবে এসব ইস্যুতে অভিন্ন অবস্থান তৈরি করা ব্রিকসের জন্য সহজ নয়।
কারণ জোটের ভেতরেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ মতবিরোধ। ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত একই জোটের সদস্য হলেও ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধে দুই দেশের অবস্থান ভিন্ন। গত বছর ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানিয়ে যৌথ ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছরের মে মাসে ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে এ বিষয়ে কোনো যৌথ ঘোষণা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
ব্রিকসের সম্প্রসারণও জোটটির জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। ২০২৪ সাল থেকে মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইন্দোনেশিয়া জোটে যুক্ত হয়েছে। অংশীদার দেশগুলোকে নিয়ে বর্তমানে ব্রিকস বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা এবং ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় ৪০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করছে। তবে সদস্য সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জোটের সব দেশের মধ্যে অভিন্ন অবস্থান তৈরি করাও আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
এদিকে ভারত ও চীনের সম্পর্কের উন্নতির বিষয়টিও এবারের সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। সাত বছর পর ভারতে গেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
ব্রিকস নিয়ে এক বিশ্লেষণে জিন্দাল গ্লোবাল ল স্কুলের অধ্যাপক ও সহকারী ডিন ভেসেলিন পোপোভস্কি এবং নয়ডার অ্যামিটি ল স্কুলের শিক্ষক ও বেঙ্গালুরুর ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব জাস্টিস অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্সেসের সম্মানসূচক অধ্যাপক পাওয়ান কুমার বলেন, ব্রিকসের মূল শক্তি কোনো একটি ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং অর্থায়ন, অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা এবং কূটনৈতিক প্রভাব তৈরির দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়াই জোটটির বড় শক্তি। এই প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে ছোট দেশগুলোর কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তারা।
অন্যদিকে আল জাজিরার নয়াদিল্লির প্রতিবেদক উম-ই-কুলসুম শরিফ বলেন, আয়োজক দেশ ভারতকে বাণিজ্য, অর্থায়ন, প্রযুক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা, সরবরাহব্যবস্থা ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামলাতে হচ্ছে। তাঁর মতে, ব্রিকসের ২০ বছর পূর্তিতে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে নতুন সদস্যদের নিয়ে জোটটি বিশ্বের দক্ষিণের দেশগুলোকে কতটা শক্তিশালী করতে পারে।
এসি//