আন্তর্জাতিক

বাংলাদেশ থেকে পরিবার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার ৮ বৈধ উপায়

বাংলাদেশ থেকে পুরো পরিবার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাতে চান অনেকেই। কারও লক্ষ্য স্থায়ীভাবে সেখানে বসবাস করে গ্রিন কার্ড পাওয়া, আবার কেউ চাকরি, ব্যবসা কিংবা উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে কয়েক বছর বৈধভাবে থাকতে চান। তবে পরিবারের সবাইকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার জন্য একক কোনো ভিসা নেই। পরিবারের সদস্যদের বয়স, শিক্ষা, পেশা, কাজের অভিজ্ঞতা, যুক্তরাষ্ট্রে থাকা আত্মীয় এবং আর্থিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে অভিবাসনের পথও ভিন্ন হয়।

বর্তমান মার্কিন অভিবাসন ব্যবস্থায় বাংলাদেশ থেকে পরিবার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার বেশ কয়েকটি বৈধ সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে কিছু পথ সরাসরি স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ তৈরি করে, আবার কিছু ভিসার মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বৈধভাবে থাকার সুযোগ পাওয়া যায়।

১. পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তিতে অভিবাসন: পরিবারের কোনো সদস্য যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক বা গ্রিন কার্ডধারী হলে নির্দিষ্ট পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তিতে বিদেশে থাকা স্বজনদের জন্য আবেদন করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা তাদের স্বামী বা স্ত্রী, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সন্তান ও বাবা-মায়ের জন্য আবেদন করতে পারেন। এ ছাড়া নাগরিকের কিছু প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান এবং ভাই-বোনও নির্দিষ্ট পারিবারিক শ্রেণির আওতায় আসতে পারেন।

অন্যদিকে, গ্রিন কার্ডধারীরা সাধারণত তাদের স্বামী বা স্ত্রী এবং অবিবাহিত সন্তানদের জন্য আবেদন করতে পারেন। তবে সব শ্রেণিতে সঙ্গে সঙ্গে ভিসা পাওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তারিখ অনুযায়ী দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। কোনো কোনো শ্রেণিতে এই অপেক্ষার সময় প্রায় ১২ থেকে ১৪ বছর পর্যন্ত হতে পারে।

২. চাকরির মাধ্যমে অভিবাসন: যোগ্য চাকরি, উচ্চতর ডিগ্রি, বিশেষ দক্ষতা কিংবা উল্লেখযোগ্য পেশাগত যোগ্যতা থাকলে কর্মসংস্থানের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে ইবি-১, ইবি-২ ও ইবি-৩ উল্লেখযোগ্য।

কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন হয়। আবার ইবি-২-এর জাতীয় স্বার্থে ছাড়ের মতো নির্দিষ্ট ব্যবস্থায় যোগ্য ব্যক্তি নিজেই আবেদন করার সুযোগ পেতে পারেন।

মূল আবেদনকারী যোগ্য হলে তার স্বামী বা স্ত্রী এবং ২১ বছরের কম বয়সী অবিবাহিত সন্তানরাও একই অভিবাসন প্রক্রিয়ায় নির্ভরশীল সদস্য হিসেবে যুক্ত হতে পারেন।

৩. ইবি-২ ও জাতীয় স্বার্থে ছাড়: উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য ইবি-২ একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিবাসন ব্যবস্থা। উচ্চতর ডিগ্রি, দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতা কিংবা বিশেষ দক্ষতা থাকা ব্যক্তিরা এই শ্রেণিতে আবেদন করার সুযোগ পেতে পারেন।

এর পাশাপাশি নিজের কাজ বা পেশাগত যোগ্যতা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ—এটি প্রমাণ করতে পারলে জাতীয় স্বার্থে ছাড়ের মাধ্যমে কিছু ক্ষেত্রে চাকরির প্রস্তাব বা শ্রম সনদের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এই পথেও মূল আবেদনকারী যোগ্য হলে তার স্বামী বা স্ত্রী এবং ২১ বছরের কম বয়সী অবিবাহিত সন্তানরা একই আবেদনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন।

৪. ইবি-৫ বিনিয়োগকারী কর্মসূচি: বড় অঙ্কের বৈধ বিনিয়োগের সক্ষমতা রয়েছে—এমন পরিবারের জন্য ইবি-৫ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থায়ী অভিবাসনের পথ। এ ব্যবস্থায় নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের পাশাপাশি বিনিয়োগের মাধ্যমে যোগ্য কর্মসংস্থান তৈরির শর্ত পূরণ করতে হয়। যোগ্য ইবি-৫ বিনিয়োগকারীর স্বামী বা স্ত্রী এবং ২১ বছরের কম বয়সী অবিবাহিত সন্তানরাও গ্রিন কার্ডের জন্য আবেদন করতে পারেন।

৫. ই-২ বিনিয়োগকারী ভিসা: বাংলাদেশ ই-২ চুক্তিভুক্ত দেশের তালিকায় থাকায় যোগ্য বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য এই ভিসার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে একটি বাস্তব ও পরিচালনাযোগ্য ব্যবসায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীকে ব্যবসাটি পরিচালনা ও উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হয়। মূল আবেদনকারীর স্বামী বা স্ত্রী এবং ২১ বছরের কম বয়সী অবিবাহিত সন্তানরা নির্ভরশীল সদস্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারেন। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে ই-২ ভিসাধারীর স্বামী বা স্ত্রী কাজের সুযোগও পেতে পারেন। তবে ই-২ স্থায়ী বসবাসের ভিসা নয়। ব্যবসা ও ভিসার শর্ত বজায় রেখে এই ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে থাকতে হয়।

৬. এইচ-১বি ও এইচ-৪: কোনো বাংলাদেশি পেশাজীবী যুক্তরাষ্ট্রের যোগ্য নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এইচ-১বি মর্যাদা পেলে তার স্বামী বা স্ত্রী এবং ২১ বছরের কম বয়সী অবিবাহিত সন্তানরা এইচ-৪ নির্ভরশীল মর্যাদায় যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারেন। এইচ-১বি নিজে গ্রিন কার্ড নয়। তবে যোগ্য কর্মীর ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে কর্মসংস্থানের ভিত্তিতে স্থায়ী বসবাসের পথ তৈরি হতে পারে। বর্তমানে নতুন এইচ-১বি আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থাকা নির্দিষ্ট আবেদনকারীদের ওপর অতিরিক্ত অর্থপ্রদানসহ কিছু বিশেষ বিধিনিষেধ রয়েছে। তাই এই ভিসার মাধ্যমে পরিবার নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করলে আবেদনের সময়কার সর্বশেষ সরকারি নিয়ম যাচাই করা জরুরি।

৭. এল-১ ও এল-২: বাংলাদেশে কোনো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বা একই করপোরেট গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপক, নির্বাহী কর্মকর্তা অথবা বিশেষায়িত জ্ঞানসম্পন্ন কর্মী হিসেবে কাজ করা ব্যক্তিরা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে বদলি হয়ে এল-১ মর্যাদা পেতে পারেন। এল-১ কর্মীর স্বামী বা স্ত্রী এবং ২১ বছরের কম বয়সী অবিবাহিত সন্তানরা এল-২ নির্ভরশীল মর্যাদায় যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারেন। নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী যোগ্য এল-২ স্বামী বা স্ত্রী কাজের সুযোগও পেতে পারেন। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন এবং একই প্রতিষ্ঠানের যুক্তরাষ্ট্রে কার্যালয় রয়েছে—এমন পেশাজীবীদের জন্য এই পথটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

৮. এফ-১ ও এফ-২: পরিবারের কোনো সদস্য যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পূর্ণকালীন পড়াশোনার সুযোগ পেলে এফ-১ শিক্ষার্থী মর্যাদায় সেখানে যেতে পারেন। তার স্বামী বা স্ত্রী এবং ২১ বছরের কম বয়সী অবিবাহিত সন্তানরা এফ-২ নির্ভরশীল মর্যাদায় যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারেন। তবে এফ-১ ও এফ-২ স্থায়ী অভিবাসনের ব্যবস্থা নয়। অর্থাৎ এই ভিসার মাধ্যমে সরাসরি গ্রিন কার্ড পাওয়া যায় না। তবে শিক্ষার্থী পরবর্তী সময়ে যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানভিত্তিক বা অন্য কোনো বৈধ অভিবাসনের পথ তৈরি করতে পারেন।

পরিবার নিয়ে যাওয়ার আগে যা জানা জরুরি

বাংলাদেশ থেকে পুরো পরিবার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পরিকল্পনা করলে প্রথমেই ঠিক করতে হবে লক্ষ্যটি কী—স্থায়ীভাবে বসবাস, নাকি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য থাকা। স্থায়ীভাবে যাওয়ার ক্ষেত্রে পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তিতে অভিবাসন, কর্মসংস্থানের মাধ্যমে অভিবাসন এবং ইবি-৫ গুরুত্বপূর্ণ পথ। অন্যদিকে ই-২, এইচ-১বি, এল-১ ও এফ-১ মূলত অস্থায়ী বা অভিবাসনবহির্ভূত মর্যাদার ব্যবস্থা।

একজন পরিবারের সদস্যের ভিসা বা আবেদন অনুমোদিত হলেই অন্য সদস্যরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার অধিকার পান না। স্বামী বা স্ত্রী ও সন্তানদের নির্ভরশীল বা সহ-আবেদনকারী হিসেবে যুক্ত করার ক্ষেত্রে বয়স, বৈবাহিক অবস্থা, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সংশ্লিষ্ট ভিসার শর্ত পূরণ করতে হয়।

তাই পরিবার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে বয়স, শিক্ষা, পেশা, কাজের অভিজ্ঞতা, যুক্তরাষ্ট্রে থাকা আত্মীয়, ব্যবসা বা বিনিয়োগের সক্ষমতা এবং স্থায়ী না অস্থায়ী—কোন ধরনের থাকার লক্ষ্য রয়েছে, সেসব বিষয় বিবেচনা করে পথ নির্বাচন করা জরুরি।

 

আবেদনের আগে মার্কিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসন পরিষেবা এবং মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সর্বশেষ নিয়ম যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন হলে অভিজ্ঞ মার্কিন অভিবাসন আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে আবেদন করাই নিরাপদ।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন