দেশজুড়ে

ভিসার মেয়াদ নেই, আড়াই বছর ধরে কক্সবাজারে নিউজিল্যান্ডের সেই পরিবার

কক্সবাজারের নাজিরারটেক সংলগ্ন সাগরে হাউসবোট ডুবে নিউজিল্যান্ডের কিশোর আলবার্ট (১৬) নিহত হয়েছেন।  নিউজিল্যান্ডের ওই পরিবারের কোনো সদস্যেরই বর্তমানে বৈধ ভিসা নেই।  এমনকি পরিবারের সদস্যদের পাসপোর্টের মেয়াদও গত ১৬ জানুয়ারি শেষ হয়ে গেছে।  প্রায় আড়াই বছর ধরে নিজেদের তৈরি বিলাসবহুল হাউসবোটে করে কক্সবাজার উপকূলে বসবাস করছিল পরিবারটি।

বুধবার (২৬ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে সাগর থেকে আলবার্টের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

জানা গেছে, সাগরপথে বিশ্বভ্রমণের উদ্দেশ্যে নিউজিল্যান্ডের নাগরিক জন এডওয়ার্ড (৭৪), তার স্ত্রী বেলা (৩৬) ও দুই ছেলেকে নিয়ে ২০২৪ সালে টুরিস্ট ভিসায় বাংলাদেশে আসেন। পরে কক্সবাজারের এসএম পাড়া উপকূলে প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে ‘আইল্যান্ড গার্ল’ নামে আধুনিক নকশার একটি জোড়া বোট বা হাউসবোট তৈরি করেন তারা।

শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ, ফ্রিজ, রান্নাঘরসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত হাউসবোটটি তৈরি করতে প্রায় দুই বছর সময় লাগে। এরপর থেকে এই নৌযানেই বসবাস করছিল পরিবারটি।  মাঝেমধ্যে তারা সমুদ্রযাত্রায় বের হয়ে আবার কক্সবাজার উপকূলে ফিরে আসতেন।

কক্সবাজার সদর থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী জানান, জীবিত উদ্ধার হওয়া তিন নিউজিল্যান্ডের নাগরিককে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে।

কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার জানান, নিউজিল্যান্ডের ওই পরিবারের কোনো সদস্যেরই বর্তমানে বৈধ ভিসা নেই। তাদের পাসপোর্টের মেয়াদও গত ১৬ জানুয়ারি শেষ হয়েছে।  এমনকি ১৩ বছর বয়সী ছোট ছেলে রালফের ভিসা-সংক্রান্ত কোনো নথিপত্রও পাওয়া যায়নি।

বোটডুবির ঘটনা জানানো হলে ঢাকায় অবস্থিত নিউজিল্যান্ডের দূতাবাসের প্রতিনিধিরা বুধবার বিকেলে কক্সবাজারে পৌঁছান।  আইনি প্রক্রিয়া শেষে জীবিত উদ্ধার হওয়া পরিবারের সদস্যদের দূতাবাসের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এর আগে চলতি বছরের ৮ এপ্রিল রাতে মহেশখালীর সোনাদিয়া চরে জলদস্যুদের হামলার শিকার হয়েছিল পরিবারটি। পরদিন কোস্টগার্ড সদস্যরা তাদের উদ্ধার করেন। একই সঙ্গে নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে তাদের এ ধরনের সমুদ্রযাত্রা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।

সে সময় পাসপোর্ট যাচাই করে তাদের ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার বিষয়টি জানা যায়। এরপর থেকে পরিবারটি কোস্টগার্ডের নজরদারিতে থাকলেও পরবর্তী সময়ে তারা আবারও সাগরে পাড়ি জমায়।

উদ্ধার হওয়া কিশোর রালফ জানায়, ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে তারা হাউসবোট ‘আইল্যান্ড গার্ল’ নিয়ে সমুদ্রপথে চট্টগ্রামের দিকে যাচ্ছিল।  দুর্ঘটনার সময় সে ও তার বাবা নৌকার ডেকে ছিলেন।  আর তার মা ত্রিপলের ছাউনির নিচে ছোট ভাই আলবার্টকে লাইফ জ্যাকেট পরাচ্ছিলেন।

রালফের ভাষ্য, হঠাৎ নৌকাটি ভেঙে দুই টুকরো হয়ে যায়।  তার ধারণা, ওই সময় আলবার্টের লাইফ জ্যাকেটের ক্লিপটি ঠিকভাবে আটকানো ছিল না। এ ছাড়া আলবার্ট সাঁতার জানত না বলেও জানায় সে।

রালফ আরও জানায়, প্রায় আড়াই বছর ধরে তারা ওই হাউসবোটেই কক্সবাজারের আশপাশের নৌপথে অবস্থান করছিল।  এ সময় তারা সমুদ্র ও নদীপথে নৌযানে করে বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াত করেছে।

বোটডুবির পর স্থানীয় জেলেরা জন এডওয়ার্ড, তার স্ত্রী বেলা ও ছোট ছেলে রালফকে জীবিত উদ্ধার করে কোস্টগার্ডের কাছে হস্তান্তর করেন।  তবে বড় ছেলে আলবার্ট নিখোঁজ ছিল।  প্রায় ৩২ ঘণ্টা পর বুধবার বিকেলে সাগরে ভেসে ওঠে তার মরদেহ।

আই/এ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন