ভারতকে ভয় পেয়েই কি ফেলানী ও মোদিবিরোধী আন্দোলনের ছবি সরানো হয়েছে: নাহিদ ইসলাম
জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, জুলাই জাদুঘরের প্রদর্শনী থেকে ফেলানী হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি সংবলিত ছবি, সীমান্ত হত্যার তথ্য এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিবিরোধী আন্দোলনের কিছু ছবি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
শনিবার (০৯ আগস্ট) সকালে জুলাই জাদুঘর পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ভারতকে ভয় পেয়েই কি বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এসব ঐতিহাসিক উপাদান প্রদর্শনী থেকে বাদ দিয়েছে?
নাহিদ ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ তারা যখন জুলাই জাদুঘর পরিদর্শনে এসেছিলেন, তখন সেখানে ফেলানীর স্মৃতি সংবলিত ছবি এবং সীমান্তে ভারতীয় বাহিনীর হাতে নিহত বাংলাদেশিদের তথ্যের একটি অংশ প্রদর্শিত ছিল। পাশাপাশি মোদিবিরোধী আন্দোলনের কিছু স্থিরচিত্রও ছিল। তবে শনিবার জাদুঘর পরিদর্শনের সময় এসবের কোনোটি দেখতে পাননি বলে জানান তিনি।
বিএনপি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ বললেও যদি এসব ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ হয়, তাহলে সেগুলো জাদুঘরে থাকবে না কেন—সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, গত ১৬ বছরে বাংলাদেশে যে ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার সঙ্গে ভারত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিভিন্নভাবে সম্পৃক্ত ছিল। অথচ জুলাই জাদুঘরের বর্তমান প্রদর্শনীতে সেই ইতিহাস যথাযথভাবে উঠে আসেনি।
তার মতে, পুরো জাদুঘর ঘুরলে মনে হতে পারে, এখানে কেবল দেশের অভ্যন্তরে সংঘটিত ফ্যাসিবাদী শাসনের ইতিহাসই তুলে ধরা হয়েছে। অথচ এর সঙ্গে সম্পৃক্ত বিদেশি শক্তিগুলোর ভূমিকা, বিশেষ করে ভারতের ভূমিকার বিষয়টিও বিভিন্নভাবে প্রদর্শনীতে থাকা প্রয়োজন।
জাদুঘর থেকে গত ১৬ বছরে ভারতের ভূমিকা এবং মোদিবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস বাদ দেওয়ার প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, এসব সরিয়ে হয়তো মনে করা হচ্ছে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখা সহজ হবে। কিন্তু ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো কিংবা খারাপ—যাই হোক না কেন, সেই সম্পর্ক হতে হবে মর্যাদার ভিত্তিতে।
তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে গিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস করা উচিত নয়।
‘জুলাইয়ের ইতিহাস হতে হবে পূর্ণাঙ্গ’
জুলাই জাদুঘরের প্রদর্শনী আরও বিস্তৃত করার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন নাহিদ ইসলাম। তার মতে, গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ শুধু বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সময়ের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে তুলে ধরা প্রয়োজন।
বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মাদরাসা এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও জেলার শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ভূমিকা আলাদাভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তবে বর্তমান প্রদর্শনীতে এসব বিষয় যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি বলে অভিযোগ করেন নাহিদ।
তিনি বলেন, পরিচিত কয়েকটি মুখকে কেন্দ্র করে একই ধরনের বিষয় বারবার সামনে এসেছে। এ বিষয়ে জাদুঘরের দায়িত্বশীলদের নিজেদের পর্যবেক্ষণের কথা জানানো হয়েছে।
নাহিদ ইসলামের মতে, জুলাই জাদুঘরে কোনো রাজনৈতিক দলের একক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন থাকা উচিত নয়। এটি প্রকৃত ইতিহাসচর্চার জায়গা এবং জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্রে পরিণত হওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ইতিহাস দলীয়ভাবে উপস্থাপনের অতীত প্রবণতার কথাও তুলে ধরেন তিনি। নাহিদ বলেন, রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অতীতে পাঠ্যপুস্তক ও ইতিহাসের বয়ান পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসও যেন কোনো নির্দিষ্ট দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
জনবল বাড়ানো ও আধুনিক ব্যবস্থার দাবি
জুলাই জাদুঘরের জনবল ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, জাদুঘরটি দেখতে মানুষের আগ্রহ বাড়লেও সেই অনুযায়ী জনবল ও ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে ওঠেনি।
তার দাবি, বর্তমানে প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন জনবল দিয়ে জাদুঘরের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তাও নিতে হচ্ছে। জাদুঘরের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রায় ২০০ জন জনবল প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
জুলাই জাদুঘরকে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলারও দাবি জানান নাহিদ ইসলাম। এ জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত কাঠামো তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
একই সঙ্গে জাদুঘর পরিচালনায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শুরু থেকে যুক্ত শিক্ষার্থী, গবেষক এবং বিভিন্ন মতাদর্শের ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি।
দর্শনার্থীদের জন্য প্রশিক্ষিত গাইড বা ব্যাখ্যাকারীর পাশাপাশি অডিও গাইডসহ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালুর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন নাহিদ।
তার মতে, বিশ্বের বিভিন্ন জাতীয় ও ঐতিহাসিক জাদুঘরে অডিও গাইড ও প্রশিক্ষিত গাইডের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের প্রদর্শিত বিষয় ও ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়। জুলাই জাদুঘরেও এ ধরনের ব্যবস্থা চালু হলে দর্শনার্থীদের জন্য প্রদর্শনীগুলো আরও সহজবোধ্য হবে।
জুলাই জাদুঘর পরিদর্শনের সময় নাহিদ ইসলামের সঙ্গে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, মুখ্য সংগঠক উত্তরাঞ্চল সারজিস আলম, যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষারসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
এসি//