টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক, ব্যবস্থা নিচ্ছে বিএসটিআই
সম্প্রতি একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান Environment and Social Development Organization (ESDO) কর্তৃক পরিচালিত গবেষণায় টুথপেস্টের ৩৪টি নমুনার মধ্যে ২৬টিতে মাইক্রো প্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়ায় জনমনে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। জনগণকে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে বিএসটিআই।
এতে বলা হয়, বিএসটিআই প্রণীত বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহার সংক্রান্ত সরাসরি কোনো বিধি-নিষেধ না থাকলেও উক্ত স্ট্যান্ডার্ডে টুথপেস্ট উৎপাদনে ব্যবহারযোগ্য ৮১টি উপাদানের তালিকা প্রদান করা হয়েছে, যেখানে মাইক্রোপ্লাষ্টিক উল্লেখ নেই। বিএসটিআই হতে সনদ প্রদানের সময় টুথপেস্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যাচাই করা হয় বিধায় টুথপেষ্ট উৎপাদনের ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহারের সুযোগ নেই।
শুধু কোনো পরীক্ষায় প্লাস্টিকজাত কণা পাওয়া গেছে বলেই সেটি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার করেছে বা সেটি মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। এ জন্য আরও বিস্তারিত পরীক্ষা, কণার ধরন, উৎস, পরিমাণ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন প্রয়োজন।
এ কারণে বিএসটিআই ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে গবেষণার পূর্ণাঙ্গ তথ্য, পরীক্ষাপদ্ধতি, পরীক্ষার Raw Data এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উৎপাদনকারী ও আমদানিকারকদের কাছ থেকেও কাঁচামাল, পণ্যের উপাদান এবং সিনথেটিক পলিমার ব্যবহারের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এছাড়া বিএসটিআই নিজ উদ্যোগে বাজার ও কারখানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে দেশি বা বিদেশি স্বীকৃত পরীক্ষাগারে পুনরায় পরীক্ষা (Independent Confirmatory Testing) করার উদ্যোগ নিয়েছে। যদি পরীক্ষায় প্রমাণিত হয় যে, কোনো পণ্য বাংলাদেশ মান পূরণ করেনি অথবা অনুমোদনহীন উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে, তাহলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক ও আইনগত যাচাই ছাড়া কোনো ব্র্যান্ড বা টুথপেস্টকে অনিরাপদ বা নিম্নমানের বলে ঘোষণা করাও সঠিক হবে না।
বিএসটিআই ইতোমধ্যে বিশেষজ্ঞ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, পরিবেশ অধিদপ্তর, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, দন্ত চিকিৎসক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং ভোক্তা প্রতিনিধিদের নিয়ে টুথপেস্টের বাংলাদেশ মান পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া গেলে টুথপেস্টে ইচ্ছাকৃতভাবে প্লাস্টিক মাইক্রোবিড ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, উপাদান প্রকাশের বাধ্যবাধকতা এবং পরীক্ষাপদ্ধতি সংযোজনসহ বাংলাদেশ মান হালনাগাদ করা হবে।
বিএসটিআই জানায়, মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো ৫ মিলিমিটার বা তার চেয়ে ছোট আকারের ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা, যা খালি চোখে সাধারণত দেখা যায় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে মাইক্রোপ্লাস্টিক একটি উদীয়মান পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত উদ্বেগের বিষয়। মাইক্রোপ্লাস্টিকের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি নিয়ে এখনো গবেষণা চলমান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক মাইক্রোপ্লাস্টিকের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি নিয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন রয়েছে মর্মে জানানো হয়েছে।
সর্বপ্রথম যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সনে Microbead-Free Waters Act of 2015-তে টুথপেস্টসহ Rinse-off কসমেটিকস পণ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। ইউরোপীয় আইন Regulation (EU) 2023/2055-তে টুথপেস্টসহ Rinse-off কসমেটিকস পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধে উৎপাদনকারীদেরকে ১৭ অক্টোবর ২০২৭ পর্যন্ত সময় প্রদান করা হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশেই টুথপেস্টে ইচ্ছাকৃতভাবে সংযোজিত (intentionally added) প্লাস্টিকের মাইক্রোবিড ব্যবহার নিষিদ্ধ। ভারত, পকিস্তান, শ্রীলংকা প্রভৃতি দেশের স্ট্যান্ডার্ডে বা ISO, ASTM প্রভৃতি আন্তর্জাতিক মান সংস্থা প্রণীত মানে টুথপেস্ট পণ্যের জন্য মাইক্রোপ্লাস্টিকের কোনো মাত্রা বা ব্যবহার নিষিদ্ধের বিষয় উল্লেখ নেই। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে টুথপেস্টে অনিচ্ছাকৃতভাবে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিকের জন্য কোনো নির্দিষ্ট গ্রহণযোগ্য সীমা (Maximum Limit) বা একক পরীক্ষাপদ্ধতি এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
টুথপেস্ট পণ্যের জন্য BDS 1216:2012 Specification for Toothpaste শিরোনামে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড রয়েছে। এস. আর. ও নং ৫০-আইন/২০১৯ ও এস. আর. ও নং ৫১-আইন/২০১৯ জারির মাধ্যমে সরকার টুথপেস্ট পণ্যটি বিক্রি-বিতরণের ক্ষেত্রে বিএসটিআই হতে উক্ত স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী রাসায়নিক, মাইক্রোবায়োলজিক্যাল ও সেইফটি প্যারামিটার পরীক্ষান্তে লাইসেন্স গ্রহণ বাধ্যতামূলক করেছে।
বিএসটিআই জনগণকে অনুরোধ করছে, গুজব বা আতঙ্কে বিভ্রান্ত না হয় নিয়মিত মুখের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন, টুথপেস্ট গিলে ফেলবেন না এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের ওপর আস্থা রাখুন। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, বৈজ্ঞানিক সত্যনিষ্ঠা এবং ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় বিএসটিআই সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আই/এ