আন্তর্জাতিক

সৌদি সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্পের ইউটার্ন

দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের আলোচনা-আলোচনার পর অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তবে চুক্তি সইয়ের মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই নতুন শর্ত জুড়ে দিয়ে এর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

বুধবার (২২ জুলাই) ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিতে সই হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট। অন্যদিকে সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে অংশ নেন। কয়েক মাস বিলম্বের পর সম্পন্ন হওয়া এই চুক্তিকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছিল।

কিন্তু পরদিন বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, চুক্তি কার্যকর করতে হলে সৌদি আরবকে অবশ্যই আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দেন, সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি দেওয়া হবে না।

ট্রাম্পের এই আকস্মিক অবস্থান পরিবর্তনের পর প্রশ্ন উঠেছে, চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র একদিনের মাথায় কেন তিনি নতুন শর্ত আরোপ করলেন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তি ঘোষণার সময় ও পদ্ধতি নিয়ে হোয়াইট হাউস এবং জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল।

হোয়াইট হাউসের দাবি, সৌদি আরবের জন্য এই শর্ত নতুন নয়। ট্রাম্প শুরু থেকেই চেয়েছেন, রিয়াদ যেন আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেয়। তবে চুক্তি ঘোষণার পর প্রেসিডেন্টের নতুন শর্তের বিষয়টি প্রশাসনের পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে কাজ করা আলোচকদেরও বিস্মিত করেছে। সিএনএনের সঙ্গে কথা বলা দুটি সূত্র জানিয়েছে, শেষ মুহূর্তে এমন শর্ত যুক্ত করা হবে—এ বিষয়ে তারাও আগে থেকে অবগত ছিলেন না।

পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে হোয়াইট হাউসের কয়েকজন কর্মকর্তা জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দিকে দায় ঠেলে দেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, হোয়াইট হাউস ওই দিন চুক্তির ঘোষণা দিতে আগ্রহী ছিল না। কিন্তু জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট নির্ধারিত অনুষ্ঠান চালিয়ে যান এবং পরে সংবাদমাধ্যমের সামনেও চুক্তি নিয়ে কথা বলেন। এতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অসন্তুষ্ট হন।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেইলর রজার্স এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি সৌদি আরবের আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়ার ওপর নির্ভরশীল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জ্বালানি দলও এ বিষয়ে একমত। তার মতে, এই উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।

অন্যদিকে জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পুরো প্রক্রিয়ায় তারা হোয়াইট হাউস ও পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করেই কাজ করেছে। সমন্বয়ের অভাবের অভিযোগ সঠিক নয় বলেও তারা উল্লেখ করেছে।

মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বেন ডিটারিখ এক বিবৃতিতে বলেন, আলোচনা থেকে শুরু করে চুক্তি ঘোষণার প্রতিটি ধাপে হোয়াইট হাউস ও পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে ভিন্ন কোনো দাবি সত্য নয়।

তিনি আরও বলেন, পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি এবং আব্রাহাম অ্যাকর্ডস—উভয়ের লক্ষ্যই একই। সংঘাতের পরিবর্তে বাণিজ্য ও সহযোগিতার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই এর উদ্দেশ্য।

চুক্তির বিষয়বস্তু প্রকাশের পরই রক্ষণশীল রাজনৈতিক মহল এবং কয়েকটি প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়।

রক্ষণশীল অবস্থানের জন্য পরিচিত ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সম্পাদকীয় বোর্ড বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক সম্পাদকীয়তে লিখেছে, এই উদ্যোগের সূচনা হয়েছিল সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে। তখন সৌদি আরব আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দিলে পুরস্কার হিসেবে তাদের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

সম্পাদকীয়তে আরও বলা হয়, সে সময় রিয়াদ সেই শর্তে রাজি হয়নি। অথচ এখন ট্রাম্প প্রশাসন কোনো শর্ত ছাড়াই একই সুবিধা দিচ্ছে। এর বিনিময়ে সৌদি আরব অন্য কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

একই ধরনের প্রশ্ন তুলেছে ফক্স নিউজও। বৃহস্পতিবার সকাল সাতটার অনুষ্ঠানে উপস্থাপক ব্রায়ান কিলমিড বলেন, চুক্তিটি তার কাছে কিছুটা বিস্ময়কর মনে হয়েছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, বাইডেন প্রশাসনের সময়ও একই ধরনের আলোচনা হয়েছিল।

কিলমিডের মন্তব্য, তখন সৌদি আরবকে বলা হয়েছিল, আগে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দিতে হবে, এরপর পারমাণবিক সহযোগিতার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্পের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকা সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে সেই শর্ত ছাড়াই একই সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।

হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট সাংবাদিকদের জানান, নতুন শর্ত ঘোষণার আগে বা পরে ট্রাম্প সৌদি যুবরাজের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেননি। তবে তিনি বলেন, এই অবস্থান নতুন নয়।

লেভিটের ভাষায়, অতীতের বিভিন্ন বৈঠকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সৌদি নেতৃত্বের সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করেছেন এবং ভবিষ্যতেও এ নিয়ে যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে।

সমালোচনার মধ্যেই ট্রাম্প ঘোষণা দেন, সৌদি আরবকে আগে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দিতে হবে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মাধ্যমে কয়েকটি আরব দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছিল।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেইলর রজার্স বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি এবং আব্রাহাম অ্যাকর্ডস—দুটি উদ্যোগই মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার একই কৌশলের অংশ।

এদিকে চুক্তির পর ট্রাম্পের অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভূমিকা থাকতে পারে বলেও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সিএনএনের বরাতে জানা গেছে, ইসরায়েলের কয়েকটি সূত্রের দাবি, নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে সৌদি আরবের সঙ্গে চুক্তিতে অন্তত ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার শর্ত যুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

তবে হোয়াইট হাউস এই দাবি নাকচ করে দিয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তার মতে, চুক্তিটি এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। কারণ, এটি বাস্তবায়নের জন্য কংগ্রেসে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া তখনো শেষ হয়নি।

ফলে নতুন শর্ত আরোপের পর চুক্তির ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এখন সৌদি আরব ট্রাম্পের শর্ত মেনে নেবে কি না, কিংবা দুই দেশ আবারও আলোচনায় বসবে কি না, সেটিই দেখার বিষয়।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন