খেলাধুলা

যেসব কারণে স্মরণীয় হয়ে থাকবে ২০২৬ বিশ্বকাপ

স্পেনের শিরোপা জয়ের মধ্য দিয়ে পর্দা নেমেছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের। নিউইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে দর্শকপূর্ণ গ্যালারির সামনে অতিরিক্ত সময়ে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে লা রোজা।

তবে এই বিশ্বকাপ শুধু নতুন চ্যাম্পিয়নের গল্প নয়। ৪৮ দলের নতুন ফরম্যাট, রেকর্ডসংখ্যক ম্যাচ ও গোল, ছোট দলগুলোর বিস্ময়কর পারফরম্যান্স, দর্শক-সমর্থকদের অভিজ্ঞতা এবং নানা বিতর্ক—সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের আসর জায়গা করে নিয়েছে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত সংস্করণ হিসেবে।

৪৮ দলের নতুন বিশ্বকাপ

প্রথমবারের মতো ৪৮ দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ায় ম্যাচের সংখ্যা বেড়েছে, হয়েছে আরও বেশি গোল, ভেঙেছে একের পর এক রেকর্ড। তবে শেষ পর্যন্ত আধিপত্য ছিল পরিচিত শক্তিগুলোরই। সেমিফাইনালে জায়গা করে নেয় ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ চার দল—আর্জেন্টিনা, স্পেন, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড।

রূপকথার নায়ক কেপ ভার্দে ও নরওয়ে

শিরোপা জিততে না পারলেও কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয় জয় করেছে অভিষেককারী কেপ ভার্দে। অভিজ্ঞ ও তরুণ খেলোয়াড়দের মিশেলে গড়া দলটি স্পেন ও উরুগুয়ের সঙ্গে ড্র করে। এমনকি পরবর্তীতে রানার্সআপ হওয়া আর্জেন্টিনাকেও অতিরিক্ত সময়ে খেলতে বাধ্য করে। অন্যদিকে ‘ভাইকিং’ আবহে খেলতে থাকা নরওয়েও ছিল টুর্নামেন্টের অন্যতম চমক। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তারা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেয়।

শঙ্কা থেকে উৎসবে যুক্তরাষ্ট্র

বিশ্বকাপ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে ছিল নানা উদ্বেগ। ভিসা জটিলতা, অস্ত্র আইন এবং ফুটবল নিয়ে স্থানীয়দের আগ্রহের অভাব—এসব কারণে অনেক সমর্থকই সংশয়ে ছিলেন।

কিন্তু টুর্নামেন্ট যত এগিয়েছে, সেই ধারণা তত বদলেছে। বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে মার্কিন আতিথেয়তার নানা গল্প। বিদেশি সমর্থকদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে আপন করে নেওয়ার দৃশ্য অনেকের মন জয় করে। ইউরোপীয় সমর্থকদের কাছে আবার বিনা মূল্যে সফট ড্রিংকস পুনরায় নেওয়ার সুযোগও ছিল নতুন অভিজ্ঞতা।

কানাডার আশার আলো, মেক্সিকোর মিশ্র অভিজ্ঞতা

কানাডায় পুরুষদের ফুটবল দীর্ঘদিন ধরেই তেমন জনপ্রিয় ছিল না। তবে শেষ ষোলোয় ওঠা দলটির জন্য নতুন সম্ভাবনার বার্তা হয়ে এসেছে। ফুটবলে বিনিয়োগ বেড়েছে, মাঠেও হয়েছে রেকর্ডসংখ্যক দর্শকের উপস্থিতি। অন্যদিকে মেক্সিকোতে ফুটবল বরাবরই জনপ্রিয়। সেখানকার স্টেডিয়ামগুলো প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই দর্শকে ভরপুর ছিল, বিশেষ করে স্বাগতিকদের ম্যাচে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। তবে ৪০ বছর পর বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জয় উদ্‌যাপন করতে গিয়ে দর্শকদের পদদলিত হওয়ার ঘটনায় চারজনের মৃত্যু হয়। পাশাপাশি টুর্নামেন্টের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুফল নিয়েও খুব বেশি আশাবাদ দেখা যায়নি।

প্রত্যাশার বাইরে যেতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র

নিজেদের মাঠে খেলেও শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নেয় যুক্তরাষ্ট্র। আগের ম্যাচে লাল কার্ড পাওয়া দলের প্রধান স্ট্রাইকারের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্তও দলের ভাগ্য বদলাতে পারেনি। সব আলোচনা শেষে একটি বিষয়ই স্পষ্ট হয়েছে—মাঠের পারফরম্যান্সে যুক্তরাষ্ট্র মোটামুটি প্রত্যাশার মধ্যেই ছিল।

বিশ্বকাপ এখন কি শুধু ধনীদের জন্য?

এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছে টিকিটের উচ্চমূল্য। আগের আসরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি দাম হলেও দর্শকের ঘাটতি হয়নি। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপে সরাসরি খেলা দেখতে যাওয়া এখন ক্রমেই সাধারণ সমর্থকদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি ভিসা জটিলতায় থাকা অনেক দেশের সমর্থকেরাও মাঠে উপস্থিত হতে পারেননি। সেই ঘাটতি কিছুটা পূরণ করেছেন প্রবাসী সমর্থক এবং স্থানীয় মার্কিন দর্শকেরা।

রাজনীতি ঢুকেছে মাঠেও

ফিফার নিয়ম অনুযায়ী স্টেডিয়ামের ভেতরে রাজনৈতিক বার্তা বা প্রদর্শনের অনুমতি নেই। তবু কয়েকটি ম্যাচে এমন ঘটনা ঘটেছে। তবে সেসব ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে আয়োজকদের দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি এবং খেলা স্বাভাবিকভাবেই চলতে থাকে।

‘আমেরিকান’ ছোঁয়া নিয়ে বিতর্ক

২০২৬ বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রীড়া সংস্কৃতির কিছু প্রভাবও দেখা গেছে। খেলার মধ্যে পানিবিরতি এবং ফাইনালে হাফটাইম বিনোদন অনুষ্ঠান নিয়ে ফুটবলবিশ্বে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়।

সমালোচকদের অভিযোগ, এসব আয়োজন ম্যাচের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করেছে এবং সম্প্রচার বিজ্ঞাপনের সময় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে।

অন্যদিকে অনেক কোচের মতে, পানিবিরতি কৌশল বদলের সুযোগ এনে দিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তে থাকা তাপমাত্রার বাস্তবতায় ভবিষ্যতের ফুটবলে এমন পরিবর্তন স্থায়ী রূপও পেতে পারে।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন