আর্জেন্টিনা–মিশর ম্যাচের রেফারির প্রশংসা করলেন ফ্রান্সের কোচ
বিশ্বকাপজুড়ে রেফারিং ও ভিএআর নিয়ে বিতর্ক যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই ভিন্ন সুরে কথা বললেন ফ্রান্সের প্রধান কোচ দিদিয়ের দেশাম্পস। আর্জেন্টিনা–মিশর ম্যাচে ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়েরের সিদ্ধান্ত নিয়ে যখন সমালোচনার ঝড় বইছে, তখন সেই রেফারিরই প্রশংসা করেছেন তিনি। শুধু তাই নয়, মরক্কোর বিপক্ষে নিজেদের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচেও লেতেক্সিয়েরের মতো মানসম্পন্ন রেফারিংয়ের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন ফরাসি এই কোচ।
২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে মিশরের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়েও ৩-২ ব্যবধানে নাটকীয় জয় তুলে নেয় আর্জেন্টিনা। তবে ম্যাচের ফলের চেয়ে বেশি আলোচনায় আসে রেফারিং। দ্বিতীয়ার্ধে মিশরের একটি গোল ভিএআরের পরামর্শে বাতিল করেন ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে। সেই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ প্রকাশ করে মিশর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এবং পরে ফিফার কাছেও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানায়।
এই বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচের আগে নতুন বিতর্কের জন্ম দেয় ফিফার আরেকটি সিদ্ধান্ত। ফ্রান্স–মরক্কো ম্যাচটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আর্জেন্টিনার রেফারি ফাকুন্দো তেলোর নেতৃত্বাধীন একটি পূর্ণাঙ্গ রেফারি প্যানেলকে। তার সঙ্গে সহকারী হিসেবে থাকবেন হুয়ান পাবলো বেলাত্তি ও গ্যাব্রিয়েল চাদে, আর চতুর্থ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন দারিও হেরেরা। অর্থাৎ, অন-ফিল্ড রেফারিং দলের চারজনই আর্জেন্টিনার। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটিই প্রথম ম্যাচ, যেখানে একই দেশের পূর্ণাঙ্গ রেফারি প্যানেল দায়িত্ব পালন করছে।
আর্জেন্টিনা–ফ্রান্স ফুটবল দ্বৈরথের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের পর থেকে আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র হওয়ায় এই নিয়োগ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
স্বভাবতই সংবাদ সম্মেলনে দেশাম্পসের দিকে প্রশ্ন ধেয়ে এসেছিল—আর্জেন্টাইন রেফারিদের উপস্থিতিতে তিনি কোনো চাপ বা পক্ষপাতিত্বের আশঙ্কা করছেন কিনা। জবাবে ফরাসিদের বিশ্বকাপজয়ী এই মাস্টারমাইন্ড অত্যন্ত শান্ত ও পেশাদার প্রতিক্রিয়া দেখান।
রেফারিদের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে তিনি বলেন: "আমাদেরকে এই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। রেফারিদের প্রতি আমার গভীর সম্মান ও আস্থা রয়েছে। মাঠে আমাদের প্রতিপক্ষ মরক্কো, রেফারিরা নন। আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচে মঁসিয়ে লেটেক্সিয়ার যেমন দারুণ রেফারিং করেছেন, আমি আশা করি আমাদের ম্যাচেও রেফারিরা ঠিক তেমনই নিরপেক্ষ ও ভালো দায়িত্ব পালন করবেন।"
দেশাম্পসের এই মন্তব্যকে অনেকেই ফরাসি রেফারি লেতেক্সিয়েরের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন হিসেবে দেখছেন। কারণ, যে ম্যাচের রেফারিং নিয়ে মিশর তীব্র আপত্তি জানিয়েছে, সেই ম্যাচের রেফারিংকেই মানদণ্ড হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি।
শুধু দেশাম্পস নন, ফ্রান্সের ডিফেন্ডার দায়োত উপামেকানোও রেফারি বিতর্ককে গুরুত্ব দিতে রাজি নন। তার ভাষায়, “রেফারি কে, সেটা নিয়ে আমি ভাবি না। আমরা কখনোই এসব নিয়ে মাথা ঘামাইনি। আমাদের মনোযোগ শুধু মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচে।”
এদিকে দায়িত্ব পাওয়া ফাকুন্দো তেলো কঠোর রেফারি হিসেবেই পরিচিত। ২০২২ সালে আর্জেন্টাইন সুপার কাপের এক ম্যাচে তিনি ১০টি লাল কার্ড দেখিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন। এবার তার কাঁধে বিশ্বকাপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কোয়ার্টার ফাইনাল পরিচালনার দায়িত্ব।
মরক্কোকে নিয়েও যথেষ্ট সতর্ক দেশাম্পস।
তিনি বলেন, গত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের ফল এই ম্যাচে কোনো প্রভাব ফেলবে না। তার মতে, চার বছরে দুই দলই বদলেছে এবং মরক্কো এখন আরও শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। তাই অতীত নয়, বর্তমান পারফরম্যান্সই নির্ধারণ করবে ম্যাচের ফল।
দেশাম্পস আরও মনে করিয়ে দেন, নকআউট পর্বে মানসিক দৃঢ়তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রতিপক্ষকে যথাযথ সম্মান দেখানোও জরুরি। তার ভাষায়, “মানসিকতা আপনাকে ম্যাচ জেতায় না, তবে ভুল মানসিকতা অবশ্যই ম্যাচ হারাতে পারে।”
১৯৯৮ সালে খেলোয়াড় হিসেবে এবং ২০১৮ সালে কোচ হিসেবে ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ জেতানো দিদিয়ের দেশাম্পসের অধীনেই ২০২২ আসরে রানার্সআপ হয়েছিল লে ব্লুস। এরই মধ্যে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, চলতি বিশ্বকাপ শেষেই ফ্রান্সের কোচের দায়িত্ব ছাড়বেন। তাই মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচটি হতে পারে তার বিদায়ের মঞ্চ, আবার হতে পারে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার সিঁড়ি। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টাইন রেফারিদের পরিচালনায় মরক্কো বাধা টপকে ফ্রান্স সেমিফাইনালে যেতে পারে কিনা, তা দেখার অপেক্ষায় এখন পুরো ফুটবল বিশ্ব। তবে বিদায় নিয়ে এখনই ভাবতে রাজি নন দেশাম্পস। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি এখন শুধু মরক্কো ম্যাচ নিয়েই ভাবছি। আমি ভাবছি না, কালই আমার শেষ দিন।”
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
এসি//