রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে রোডম্যাপ দাবি
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কূটনৈতিক উদ্যোগ ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনে রোডম্যাপের দাবি জানিয়েছেন কক্সবাজারের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। মানবিক সহায়তা কাঠামোকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্বচ্ছ এবং স্থানীয় নেতৃত্বনির্ভর করা না হলে দীর্ঘমেয়াদে সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন তারা।
রোববার (২১ জুন) বিকেলে কক্সবাজারে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ে আয়োজিত সেমিনারে বিশ্ব শরণার্থী দিবস উপলক্ষে এ দাবি জানান তারা।
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে প্রায় ১.৬ মিলিয়ন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিচ্ছে—যা ২০১৭ সালের গণ-আগতির পর থেকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকট হিসেবে বিবেচিত। এই দীর্ঘ মানবিক সংকটে সরকার, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, জাতিসংঘ সংস্থা এবং দেশি-বিদেশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো ধারাবাহিকভাবে সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
বক্তারা জানান, ২০২৬ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনা (জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান) অনুযায়ী কক্সবাজার ও ভাসানচরের রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য ৭১০.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা চাওয়া হলেও এখন পর্যন্ত এর অর্ধেকেরও কম অর্থ পাওয়া গেছে।
বক্তারা অভিযোগ করেন, তহবিল বণ্টনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রাধান্য থাকলেও সাম্প্রতিক অর্থায়ন কাঠামো অনুযায়ী বরাদ্দের প্রায় ৯২ শতাংশ গেছে জাতিসংঘ সংস্থাগুলোর কাছে এবং ৮ শতাংশ আন্তর্জাতিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কাছে; অথচ স্থানীয় সংস্থাগুলো সরাসরি কোনো তহবিল পায়নি। এ প্রেক্ষাপটে তারা জাতিসংঘের “মানবিক সংস্কার” নীতির আলোকে অন্তত ৭০ শতাংশ তহবিল স্থানীয় ও জাতীয় সংস্থার মাধ্যমে বাস্তবায়নের দাবি জানান।
সেমিনারে বক্তারা একটি নতুন “জয়েন্ট রেপ্যাট্রিয়েশন প্ল্যান ২.০” কাঠামোর প্রস্তাব দেন, যা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ নির্ধারণ করবে। এতে স্থানীয় সরকার, জেলা প্রশাসন এবং শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কোস্ট ফাউন্ডেশনের মোঃ ইকবাল উদ্দিন এবং সেমিনারের সঞ্চালনা করেন কক্সবাজার সিএসও এনজিও ফোরাম (সিসিএনএফ)-এর সাধারণ সম্পাদক মোঃ জাহাঙ্গীর আলম।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর স্ট্র্যাটেজিক ওভারসাইট সার্ভিসের প্রধান মার্সেল গ্রোগান, রোহিঙ্গা সমন্বয় প্ল্যাটফর্মের প্রধান ডেভিড বাগডেন, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, টেকনাফ উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মর্জিনা আক্তার, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের কলিম উল্লাহ, পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মোজাফফর আহমেদ, পালস বাংলাদেশের সাইফুল ইসলাম চৌধুরী কলিম, রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হেলাল উদ্দিন, রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মীর কাশেম, অগ্রযাত্রার নীলিমা আক্তার চৌধুরী, হেল্প কক্সবাজারের আবুল কাশেম, টেকনাফ উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট হাসান সিদ্দিকী এবং কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সভাপতি মাহাবুবুর রহমান।
বক্তারা কক্সবাজার ও টেকনাফ অঞ্চলের পরিবেশগত সংকট, নিরাপদ পানি সংকট এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। কেউ কেউ ভূগর্ভস্থ পানির বিকল্প হিসেবে নাফ নদীর পরিশোধিত পানি ব্যবহারের প্রস্তাব দেন।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ক্যাম্পে মাদক ও অস্ত্র পাচার রোধ, নিরাপত্তা জোরদার এবং স্বাগতিক জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবি জানান। পাশাপাশি পরিবেশ পুনরুদ্ধার, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং স্থানীয় সহাবস্থান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
আই/এ