যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি সমঝোতার ১৪ দফা খসড়া প্রকাশ
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি এবং ভবিষ্যৎ চূড়ান্ত চুক্তির জন্য প্রস্তাবিত ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের বিস্তারিত প্রথমবারের মতো প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এই খসড়ার বিষয়বস্তু তুলে ধরেছেন।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখনো যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইরান—কোনো পক্ষই চুক্তির পূর্ণাঙ্গ লিখিত কপি প্রকাশ করেনি। একই সঙ্গে মার্কিন কর্মকর্তার বর্ণিত খসড়ার সত্যতাও ইরানি কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেননি।
খসড়ার প্রথম দফায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং চলমান যুদ্ধে তাদের মিত্ররা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করবে। একই সঙ্গে একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, সামরিক অভিযান, শক্তি প্রয়োগ কিংবা শক্তি প্রয়োগের হুমকি থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকার করবে। লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার বিষয়টিও এতে উল্লেখ রয়েছে।
দ্বিতীয় দফায় দুই পক্ষের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান দেখানোর অঙ্গীকার রাখা হয়েছে। পাশাপাশি একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার কথাও বলা হয়েছে।
তৃতীয় দফা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা শেষ করার অঙ্গীকার করেছে। তবে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে এই সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে।
চতুর্থ দফায় বলা হয়েছে, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ অবরোধ এবং অন্যান্য বাধা অপসারণ শুরু করবে। ৩০ দিনের মধ্যে নৌ অবরোধ পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হবে। একই সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের নিকটবর্তী এলাকা থেকে মার্কিন বাহিনী সরিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকারও রাখা হয়েছে।
পঞ্চম দফা অনুযায়ী, ইরান ৬০ দিনের জন্য কোনো ফি ছাড়াই পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর এবং ওমান সাগর থেকে পারস্য উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপদ ব্যবস্থা করবে। প্রযুক্তিগত ও সামরিক প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং মাইন অপসারণের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে ৩০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ নৌ চলাচল চালুর কথা বলা হয়েছে। হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও সামুদ্রিক সেবা নিয়ে ওমানসহ উপসাগরীয় উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে আলোচনার কথাও খসড়ায় রয়েছে।
ষষ্ঠ দফায় ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পরিকল্পনা তৈরির কথা বলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে মিলে এই পরিকল্পনা করবে এবং ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে বাস্তবায়ন কাঠামো নির্ধারণ করা হবে। সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের জন্য প্রয়োজনীয় লাইসেন্স, ছাড়পত্র ও অনুমোদন দেওয়ার কথাও এতে উল্লেখ রয়েছে।
সপ্তম দফায় ইরানের বিরুদ্ধে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অঙ্গীকার করা হয়েছে। এর মধ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিচালনা পর্ষদের প্রস্তাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা প্রাথমিক ও গৌণ নিষেধাজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। সম্মত সময়সূচি অনুযায়ী চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে এসব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে।
অষ্টম দফায় ইরান পুনরায় নিশ্চিত করেছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ বা উন্নয়ন করবে না। সঞ্চিত সমৃদ্ধ পারমাণবিক উপাদানের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা পারস্পরিকভাবে সম্মত একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। ন্যূনতম পদ্ধতি হিসেবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার তত্ত্বাবধানে স্থানীয়ভাবে উপাদানের সমৃদ্ধির মাত্রা কমানোর কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পর্কিত সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম নিয়ে আলোচনার কথাও খসড়ায় রয়েছে।
নবম দফায় চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রাখার কথা বলা হয়েছে। এ সময়ে ইরান তার বর্তমান পারমাণবিক কর্মসূচির অবস্থা বজায় রাখবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না বা অঞ্চলে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করবে না।
দশম দফায় বলা হয়েছে, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ইরানি অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়াম পণ্য ও সংশ্লিষ্ট সব উপপণ্য রপ্তানির জন্য ছাড়পত্র দেবে। ব্যাংকিং লেনদেন, বীমা, পরিবহনসহ সংশ্লিষ্ট সেবাও এর আওতায় থাকবে।
একাদশ দফায় ইরানের জব্দকৃত ও স্থগিত সব তহবিল এবং সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ উন্মুক্ত করার অঙ্গীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সমঝোতা স্মারক কার্যকর হওয়ার পর দুই দেশ আলোচনার মাধ্যমে এসব তহবিল মুক্ত করার পদ্ধতি নির্ধারণ করবে। ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে চূড়ান্ত সুবিধাভোগী নির্ধারণ করবে, তার কাছে অর্থপ্রদানের জন্য এসব তহবিল ব্যবহারযোগ্য করার কথাও এতে বলা হয়েছে।
দ্বাদশ দফায় সমঝোতা স্মারকের সফল বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যৎ চূড়ান্ত চুক্তির প্রতিপালন তদারকির জন্য একটি কার্যনির্বাহী ব্যবস্থা গঠনের কথা বলা হয়েছে।
ত্রয়োদশ দফায় বলা হয়েছে, প্রথম, চতুর্থ, পঞ্চম, দশম ও একাদশ দফার বাস্তবায়ন শুরু ও অব্যাহত থাকার শর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান বাকি বিষয়গুলো নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা শুরু করবে।
চতুর্দশ দফা অনুযায়ী, ভবিষ্যৎ চূড়ান্ত চুক্তিটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে।
মার্কিন কর্মকর্তার দাবি, সমঝোতা স্মারকটি ইতোমধ্যে ইলেকট্রনিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের আগে উভয় পক্ষই চাইলে এ প্রক্রিয়া থেকে সরে আসতে পারবে।
এমএ//