লেবানন রক্ষায় শক্তি ও কূটনীতি ব্যবহার করবে তেহরান: বাঘের গালিবাফ
লেবাননের রাজধানী বৈরুতকে রক্ষা করতে প্রয়োজন হলে শক্তি ও কূটনীতি—দুই পথই ব্যবহার করবে তেহরান। এমন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ এবং লেবাননে ইসরাইলি হামলাকে সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনার মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, পশ্চিমা দেশগুলোর উসকানি অব্যাহত থাকলে ইরান প্রয়োজনীয় জবাব দিতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলমান আলোচনা সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য নয়, বরং আঞ্চলিক যুদ্ধের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যেই পরিচালিত হচ্ছে।
এক অডিও বার্তা ও পরবর্তী বক্তব্যে গালিবাফ বলেন, কূটনৈতিক আলোচনায় অংশ নেওয়ার অর্থ এই নয় যে ইরান তার সামরিক প্রস্তুতি থেকে সরে আসবে। তার ভাষায়, "আমাদের যুদ্ধ আর আলোচনার মধ্যে একটি বেছে নিতে হবে না। সঠিক সময়ে যুদ্ধ করতে হবে, আবার সঠিক সময়ে আলোচনাও করতে হবে।"
এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে ইরান ও ইসরাইলের পাল্টাপাল্টি হামলার মাধ্যমে। এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর প্রথমবারের মতো এই ধরনের হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আপাতত উভয় পক্ষ সামরিক অভিযান স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ হলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সোমবার এক টেলিভিশন ভাষণে জানান, বর্তমানে ইসরাইল হামলা বন্ধ রেখেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরান ও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সংঘাত এখনো শেষ হয়নি।
অন্যদিকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী জানায়, ইসরাইলকে “কঠোর জবাব” দেওয়ার পর তারা সামরিক অভিযান স্থগিত করেছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে আবার হামলা হলে আরও “কঠিন ও বিধ্বংসী” প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারিও দেয় তেহরান।
এর আগে রোববার বৈরুতে ইসরাইলি হামলার জবাবে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় বলে দাবি করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার ভোরে ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালানোর কথা জানায় ইসরাইল।
যুক্তরাষ্ট্র এই পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিবিসিকে বলেন, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী তার নির্দেশ অমান্য করেননি। তিনি আরও দাবি করেন, একটি “শক্তিশালী চুক্তির” খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো, তাই এখন সংযম দেখানো প্রয়োজন।
হোয়াইট হাউস সূত্রে জানা যায়, ট্রাম্প ফোনে নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলেন এবং ইসরাইলি এক কর্মকর্তা দাবি করেন, ট্রাম্পের অনুরোধেই পরবর্তী হামলা বন্ধ রাখা হয়। তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানায়, ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে ইসরাইলকে একাই লড়তে হতে পারে।
এর মধ্যেই সোমবারও সংঘর্ষ থেমে থাকেনি। ইসরাইল দাবি করে, ইরান জেরুজালেমসহ মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। জবাবে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) ইরানের মাহশাহর শহরের একটি পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে হামলা চালায়, যেখানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক উৎপাদন হতো বলে দাবি করা হয়।
ইরানের জরুরি ব্যবস্থাপনা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মাহশাহরে হামলায় ১৪ জন এবং তেহরানে একজন আহত হয়েছেন।
এদিকে লেবাননেও সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, দক্ষিণাঞ্চলীয় টাইর শহরে ইসরাইলি হামলায় পাঁচজন নিহত ও আটজন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে রেড ক্রসের চারজন উদ্ধারকর্মীও রয়েছেন। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ দাবি করেছে, তারা দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি সেনা ও যানবাহন লক্ষ্য করে রকেট হামলা চালিয়েছে।
চলমান এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত ইরানে ৩ হাজার ৪৬৮ জন এবং লেবাননে ৩ হাজার ৬১৩ জন নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশেও হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে, যেখানে একদিকে কূটনৈতিক আলোচনা চলছে, অন্যদিকে পাল্টা হামলা ও হুঁশিয়ারির মাধ্যমে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।
সূত্র: তাসনিম নিউজ
এসি//