আন্তর্জাতিক

উপস্থাপককে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে অনুষ্ঠান থেকে বেরিয়ে গেলেন ট্রাম্প

টেলিভিশনের আলো–ঝলমলে স্টুডিও নয়, খোলা খামারের মাঝেই চলছিল রাজনৈতিক উত্তাপ। কিন্তু আলোচনার গতি যতই বাড়ছিল, ততই পরিস্থিতি হয়ে উঠছিল অস্বস্তিকর—আর শেষ পর্যন্ত সেই উত্তাপেই এনবিসি নিউজের জনপ্রিয় টকশো ‘মিট দ্য প্রেস’ ছেড়ে উঠে যান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজের এই রাজনৈতিক টকশোতে সাক্ষাৎকার চলাকালে ক্যালিফোর্নিয়ার নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে কারচুপির অভিযোগ তোলেন ট্রাম্প। তবে অভিযোগের পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য–প্রমাণ না পাওয়ায় সঞ্চালক ক্রিসটেন ওয়েলকার তার কাছে ব্যাখ্যা ও প্রমাণ চাইলে শুরু হয় তীব্র বাকবিতণ্ডা।

পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠলে একপর্যায়ে সাক্ষাৎকারের মাঝপথেই অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন ট্রাম্প।

শুক্রবার (০৫ জুন) উইসকনসিন সফরের সময় একটি খোলা খামারে এই বিশেষ সাক্ষাৎকারটি ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে রোববার (০৭ জুন) এটি টেলিভিশন এবং অনলাইনে প্রচার করা হলে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়।

এনবিসি নিউজের ওভাল অফিস স্টুডিও সূত্রে জানা গেছে, সাক্ষাৎকার চলাকালে প্রবল বৃষ্টি ও বৈরি আবহাওয়ার কারণে একাধিকবার যান্ত্রিক শব্দজনিত বিঘ্ন দেখা দিলেও দুই পক্ষের আলোচনা অব্যাহত ছিল। ইরান সংকট, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক কৌশল এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে দীর্ঘ প্রশ্নোত্তরের একপর্যায়ে ক্যালিফোর্নিয়ার সাম্প্রতিক প্রাইমারি নির্বাচন নিয়ে দুজনের মধ্যে চরম বিতর্ক শুরু হয়। 

সাক্ষাৎকারের একপর্যায়ে সঞ্চালক ক্রিসটেন ওয়েলকার উল্লেখ করেন যে ক্যালিফোর্নিয়ায় ভোট গণনার ধীরগতি ও প্রক্রিয়াটি দীর্ঘদিন ধরেই আইনগতভাবে এমন। এর জবাবে ট্রাম্প জোরালো দাবি করেন যে অঙ্গরাজ্যটির নির্বাচনে ব্যাপক ‘কারচুপি’ হয়েছে, তবে নিজের এই গুরুতর অভিযোগের পক্ষে তিনি কোনো দাপ্তরিক তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। ওয়েলকার বারবার প্রমাণ চাইলে ট্রাম্প বলেন, তিনি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে এসব শুনেছেন এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেই এমন মন্তব্য করছেন।

এরপর স্টুডিওর ভেতরের আলোচনা আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ট্রাম্প অভিযোগ করেন যে আমেরিকার মূলধারার সংবাদমাধ্যম এবং নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ উভয়ই চরম পক্ষপাতদুষ্ট। তিনি এনবিসি নেটওয়ার্ক, ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠান এবং খোদ সঞ্চালক ওয়েলকারকে ব্যক্তিগতভাবে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে আখ্যা দেন। 

ওয়েলকার পেশাদারিত্বের সাথে এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করলে ট্রাম্প পাল্টা দাবি করেন যে সঞ্চালকের করা প্রশ্নগুলো মূলত তার রাজনৈতিক বিরোধীদের স্বার্থ রক্ষা করছে। সাক্ষাৎকারের আরেক পর্যায়ে ট্রাম্প তার পূর্ববর্তী দাবি পুনরাবৃত্তি করে বলেন, গত ২০২০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং সাম্প্রতিক ক্যালিফোর্নিয়া প্রাইমারিতে সুনির্দিষ্ট অনিয়ম হয়েছে। ওয়েলকার তখনও সত্য ও প্রমাণ উপস্থাপনের আহ্বান জানিয়ে নিজের সাংবাদিকতার অবস্থানে অনড় থাকেন।

একপর্যায়ে ট্রাম্প চরম ক্ষিপ্ত হয়ে সঞ্চালক ওয়েলকারকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনি হয় পক্ষপাতদুষ্ট, নয়তো বোকা’। এরপর তিনি আকস্মিকভাবে সাক্ষাৎকার শেষ করার ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘দুঃখিত। আসুন এখানেই শেষ করি। আমার অনেক হয়েছে। ধন্যবাদ, প্রিয়। ভালো থাকবেন’। 

এই কথা বলেই তিনি নিজের গায়ের মাইক্রোফোন খুলে ফেলার ভঙ্গি করেন এবং আসন ছেড়ে দ্রুত উঠে দাঁড়ান। ক্রিসটেন ওয়েলকার তাকে শান্ত হয়ে সাক্ষাৎকার চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানালেও ট্রাম্প জানান, তিনি বৃষ্টির মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলেছেন এবং যথেষ্ট সময় দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি এবিসি, সিবিএস ও সিএনএনসহ অন্যান্য মূলধারার মার্কিন সংবাদমাধ্যমেরও তীব্র সমালোচনা করেন।

সাক্ষাৎকার শেষে ওয়াশিংটন স্টুডিও থেকে সঞ্চালক ক্রিসটেন ওয়েলকার জানান, আবহাওয়াজনিত বিঘ্ন এবং পুরো সাক্ষাৎকারজুড়ে তৈরি হওয়া উত্তেজনা নিয়ে পরবর্তীতে তার সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে আরেকটি নতুন সাক্ষাৎকারে অংশ নিতে সম্মত হয়েছেন ট্রাম্প।

এদিকে এই ঘটনাকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচনী জালিয়াতির অভিযোগের পক্ষে সাংবাদিকের প্রমাণ চাওয়ার পর প্রেসিডেন্টের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া নিয়ে দেশটির সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে।

সূত্র: বিবিসি

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন