জাতীয়

আত্মত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির বার্তা নিয়ে এলো পবিত্র ঈদুল আজহা

সাম্য, ত্যাগ ও মানবিকতার অনন্য বার্তা নিয়ে বছর ঘুরে আবারও এসেছে পবিত্র ঈদুল আজহা। মুসলমানদের ধর্মীয় জীবনের অন্যতম প্রধান এই উৎসব আজ বৃহস্পতিবার (২৮ মে) দেশজুড়ে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হচ্ছে।

হিজরি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী জিলহজ মাসের ১০ তারিখে পালিত হয় ঈদুল আজহা। ঈদুল ফিতরের মতো এ উৎসবের তারিখ নির্ধারণে শেষ মুহূর্তের অনিশ্চয়তা থাকে না। আগেভাগেই নির্ধারিত হয়ে যায় ঈদের দিনক্ষণ। সেই অনুযায়ী পশু কেনা, কোরবানির প্রস্তুতি এবং নাড়ির টানে গ্রামের বাড়িতে ফেরার আয়োজনও সম্পন্ন করেন মানুষ।

তবে এবার ঈদ এসেছে নানা বাস্তব সংকটের মধ্যে। দেশের বিভিন্ন হাওরাঞ্চলে ফসলহানির প্রভাব পড়েছে মানুষের জীবনে। হামের ভাইরাসে প্রাণহানিতে শোকাহত বহু পরিবার। দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতির চাপেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। তারপরও প্রতিকূলতার মাঝেই মানুষ খুঁজে নিচ্ছে আনন্দ, মিলন আর ভাগাভাগির উপলক্ষ।

কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়—
“ঈদুজ্জোহার চাঁদ হাসে ঐ, এলো আবার দুসরা ঈদ,
কোরবানি দে, কোরবানি দে, শোন খোদার ফরমান তাকিদ।”

ঈদ মানেই আনন্দ, ভ্রাতৃত্ব আর মিলনের উৎসব। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই নতুন কিংবা পরিচ্ছন্ন পোশাক পরে, আতরের সুবাসে সজ্জিত হয়ে মসজিদ ও ঈদগাহে এক কাতারে দাঁড়িয়ে আদায় করেন ঈদের নামাজ। নামাজ শেষে কোলাকুলি ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বার্তা।

নামাজের পর মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে সামর্থ্য অনুযায়ী পশু কোরবানি করেন মুসলমানরা। ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী আর্থিকভাবে সক্ষম প্রত্যেক মুসলমানের জন্য কোরবানি করা ওয়াজিব। হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, “যার সামর্থ্য আছে অথচ কোরবানি করে না, সে যেন আমার ঈদগাহের কাছে না আসে।”

বাংলাদেশে সাধারণত গরু, ছাগল ও মহিষ কোরবানি করা হলেও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে উট, ভেড়া ও দুম্বা কোরবানি দেওয়া হয়। অতীতে এ অঞ্চলে ছাগল বা বকরি কোরবানির প্রচলন বেশি থাকায় এই ঈদকে অনেকে ‘বকরি ঈদ’ বলেও চিনতেন। দেশভাগের পর থেকে গরু কোরবানির প্রচলন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।

ইসলামে কোরবানির মাংস তিন ভাগে বণ্টনের প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। এক ভাগ নিজের জন্য রেখে বাকি অংশ আত্মীয়স্বজন ও গরিব-দুঃখীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। এর মাধ্যমে সমাজে সাম্য, সহমর্মিতা ও ন্যায়বিচারের চর্চা জোরদার হয়।

ঈদুল আজহার সঙ্গে জড়িয়ে আছে হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-এর আত্মত্যাগের অনন্য ইতিহাস। মহান আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর প্রিয় পুত্রকে কোরবানি করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে আল্লাহর অশেষ রহমতে ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানি হয়ে যায়। সেই ঘটনার স্মরণেই মুসলমানরা প্রতি বছর কোরবানি আদায় করেন।

ইসলামের দৃষ্টিতে কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা কেবল পশু জবাই নয়; বরং মানুষের অন্তরের লোভ, হিংসা, অহংকার ও কুপ্রবৃত্তিকে দমন করা। পবিত্র কুরআনের সুরা হজে আল্লাহ বলেছেন, “তোমাদের কোরবানির পশুর গোশত বা রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।”

রাজধানীর জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে সকাল সাড়ে ৭টায় ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। আবহাওয়া প্রতিকূল হলে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে সকাল ৮টায় প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া বায়তুল মোকাররমে আরও চারটি জামাত অনুষ্ঠিত হবে সকাল ৭টা, ৯টা, ১০টা এবং পৌনে ১১টায়। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়ও সকাল সাড়ে ৭টায় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে।

রাজধানীর বাইরে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ময়দান এবং দিনাজপুরের গোর-এ-শহীদ ময়দানে অনুষ্ঠিত হয় দেশের অন্যতম বৃহৎ ঈদের জামাত। এসব জামাতে অংশ নিতে দূরদূরান্ত থেকে মুসল্লিরা ছুটে আসেন।

এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ঈদের দিন রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট ও রাজশাহী বিভাগের বেশির ভাগ এলাকায় বৃষ্টি হতে পারে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগেও হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তুলনামূলকভাবে খুলনা ও বরিশাল বিভাগে আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে।

পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশবাসী ও বিশ্ব মুসলিম উম্মাহকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ঈদুল আজহা ত্যাগ, তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির মহিমান্বিত বার্তা নিয়ে এসেছে। আল্লাহ যেন আমাদের ত্যাগ কবুল করেন এবং বিশ্বে শান্তি ও স্থিতিশীলতা দান করেন।”

ঈদ উপলক্ষে টেলিভিশন, রেডিও ও অনলাইন মাধ্যমে সম্প্রচারিত হচ্ছে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম প্রকাশ করেছে বিশেষ আয়োজন। পাশাপাশি হাসপাতাল, কারাগার, এতিমখানা ও শিশুসদনে পরিবেশন করা হচ্ছে উন্নতমানের বিশেষ খাবার।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন