দেশজুড়ে

নেত্রকোনায় অতিবৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে ফসল, বিপৎসীমার ওপরে নদীর পানি

নেত্রকোনায় টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা ও বন্যায় তলিয়ে গেছে  হাওর ও সমতল ভূমির ফসল। এছাড়া শিলাবৃষ্টিতে নষ্ট হয়েছে কৃষকের বোরো ফসল, সবজি ও মৌসুমী ফল।  অপরদিকে বৃষ্টির সাথে উজানের পাহাড়ি ঢলের পানি বাড়ছে জেলার প্রধান নদ-নদী গুলোতে। বন্যা সতর্কীকরণ পূর্বাভাসকেন্দ্র জানিয়েছে হাওর সংলগ্ন অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি অব্যহত থাকতে পারে।

বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। 

তিনি জানান, জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন জানান, আজ দুপুরে  ভোগাই-কংস  নদীর পানি জারিয়া-ঝানজাইল পয়েন্টে  বিপৎসীমার ১০০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উপদাখালি নদীর কলমাকান্দা পয়েন্টে বিপৎসীমার ৭৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে বইছে।  মগড়া নদীর পানি আটপারা পয়েন্টে বিপৎসীমার ১৮ সে.মি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে

আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, জেলায় চলতি মাসের প্রথম থেকে শুরু হয় বজ্রসহ শিলাবৃষ্টি। টানা বৃষ্টিতে হাওরে শুরু হতে থাকে জলাবদ্ধতা। পাশাপাশি  শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতির মূখে পড়ে বোরো ফসল। গত রবিবার বিকাল থেকে শুরু হয় বৃষ্টি। এরপর থেমে থেমে চলতে থাকে বজ্রসহ বৃষ্টিপাত। সর্বশেষ বুধবার নেত্রকোনায় ৮৯মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। ২৪ ঘন্টায় ৪৪ থেকে ৮৮মিলিমিটার বৃষ্টি হলে ভারি ও ৮৮ মিলিমিটার এর বেশী হলে অতিভারি বৃষ্টি বলে গন্য করা হয়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্যেনেত্রকোনায় জেলায় চলতি মৌসুমে বোরো ধান আবাদ হয়েছে ১লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে হাওরে আবাদ করা হয় ৪১হাজার ৬৫হেক্টর জমি। বাকি জমি আবাদ হয় জেলার সমতল ও পাহাড়ি অঞ্চলে। টানা বৃষ্টিতে মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরীসহ বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এছাড়াও জেলার সমতল ও পাহাড়ি অঞ্চলের অর্ধশতাধিক বিলে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এতে হাওর ও বিলে থাকা অপেক্ষকৃত নীচু জমির বোরো ধান তলিয়ে যায়। হাওরসহ জেলায় কৃষকের ৯ হাজার হেক্টরের বেশি জমির বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় তথ্য মতে, জেলার হাওরাঞ্চলসহ পুরো জেলায় ১৭হাজার ৭১৭ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। বৃষ্টিতে জেলার ১০ উপজেলায় সম্পূর্ণ ও আংশিকভাবে ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঝড়  ও অতিবৃষ্টির কারণে ১৫ পরিবারের ৬০ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বজ্রপাতে এবছর কৃষক, কৃষি শ্রমিকসহ ৬ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন একজন।

কলমাকান্দার পোগলা গ্রামের মনতাজ উদ্দিন বলেন, সোমবার ও মঙ্গলবারের বৃষ্টিতে আমার ৬ বিঘা জমির বোরো ধান পানিতে তলায়া গেছে। তাকায় দেহন ছাড়া আমরার কি আর করার নেই। আরো কিছু জমি ধান পাকছিল। ক্ষেতে হার্ভেস্টার মেশিন যায় না, শ্রমিকও পাইতাছিনা। ধানের শীষ পানির উপরে কিছুডা ভাইস্যা আছে। অহনও কাডাইতে পারলে কিছুডা ধান পাইতাম

মদনের গোবিন্দশ্রী গ্রামের কৃষক সুজন মিয়া জানান, ৪০ বিঘা জমিতে বোরো লাগাইছিলাম। এর মাঝে ৩০ বিঘার মতো কাইট্যা আনছি বহু কষ্টে। বাকি ১০বিঘা পানিতে গেছেগা। আমার জমি গোবিন্দশ্রী হাওরে সব জমি আছিল। বৃষ্টির পানি হাওরে আইটকা এই অবস্থাডা অইছে। যা ধান তুইল্যা আনছিলাম এই ধানেরও দাম পাইতাছিনা। ধান না পারতাছি শুকাইতে না পারতাছি ভিজা ধান বেচতে। গোলায়ও তুলতে পারতাছি না। ধান নষ্ট হওয়ার অবস্থায় খলায় পইড়া আছে। আমার গ্রামের অনেক কৃষকের একই অবস্থা

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক আমিরুল ইসলাম বলেন, বৃষ্টিপাতের কারণে ধান কাটা ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিদিন ২৫০০হেক্টর জমির ধান শুধু হাওরেই কাটা হতো সেখানে বৃষ্টির জন্যে কমে এসেছে একহারের কম হেক্টরে। এই অবস্তায় ৬ হাজার কৃষি শ্রমিক চেয়ে ঢাকায় পত্র পাঠিয়েছি। আগামী ১০ মে তারিখের মধ্যে হাওরের পুরো ফসল কর্তনের লক্ষ্য নেয়া হয়েছে। হাওরসহ সারা জেলায় এ নাগাদ মোট ২২ শতাংশ জমির বোরো ফসল কর্তন করা হয়েছে আর হাওরে কর্তন হয়েছে ৬৫ শতাংশ।

জেলা ত্রাণ ও পূনর্বাসন কর্মকর্তা মুহাম্মদ রুহুল আমীন জানান, অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, ঝড়সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার জন্য ২৭০মেট্রিকটন জিআর চাল, ৭লাখ টাকা জিআর ক্যাশ, ২হাজার ৩৪০বান্ডিল ঢেউটিন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পূনর্বাসনে ১৯কোটি ৬৫লাখ ৫১হাজার টাকা, ৩হাজার ৩০০প্যাকেট শুকনো খাবার। এছাড়াও গোখাদ্য বাবদ ১০লাখ টাকা, শিশু খাদ্য বাবদ ৭লাখ টাকা ও গৃহমঞ্জুরি বাবাদ ২৫লাখ ৫০হাজার টাকা চাহিদা চেয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হবে। এছাড়াও নগদ বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে ২০লাখ টাকা।

জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলায় জেলা দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা করা হয়েছে। কৃষকের বোরো ধান কর্তনসহ বন্যা মোকাবেলায় সব ধরণের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। উপজেলা পর্যায়ে ইউএনওদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। জনপ্রতিনিধিসহ সব শ্রেণী-পেশার মানুষদের সহযোগীতায় মোকাবেলা করা হবে। প্রয়োজনীয় ত্রাণ-সামগ্রী রয়েছে। আরও চাহিদাপত্র পাঠানো হচ্ছে।

আই/এ

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন