আবহাওয়া

বজ্রপাতের হটস্পট সিলেট-সুনামগঞ্জ

বাংলাদেশে বজ্রপাত এখন শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, এটি ধীরে ধীরে মানুষের জীবনে এক নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে। গত এক দশকে এই দুর্যোগে দেশে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যা বজ্রপাতকে দেশের অন্যতম ভয়াবহ আবহাওয়াজনিত বিপর্যয়ের কাতারে নিয়ে গেছে। সরকারি তথ্য ও আবহাওয়া বিশ্লেষণ বলছে, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বাংলাদেশের বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বজ্রপাতের ঝুঁকি আগের তুলনায় অনেক বেশি বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের জায়গা উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে সিলেট বিভাগ। দেশের বজ্রপাতপ্রবণ এলাকার তালিকায় সুনামগঞ্জ জেলার নাম সবচেয়ে ওপরে, আর সেই জেলার জামালগঞ্জ উপজেলাকে ধরা হচ্ছে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ‘হটস্পট’ হিসেবে। কেন এই অঞ্চল এত বেশি ঝুঁকিতে—এর পেছনে রয়েছে প্রকৃতির বিশেষ এক সমন্বয়। সিলেটের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল থেকে বিপুল জলীয় বাষ্প বাতাসে মিশে যায়। বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র বায়ু উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ে বাধা পেয়ে দ্রুত ওপরে উঠে ঠান্ডা হয়। এই প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় বিশালাকার কিউমুলোনিম্বাস বা বজ্রমেঘ, যা ভয়ংকর বজ্রপাতের মূল উৎস।

বাংলাদেশে ২০১৫ সালে বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণার পর থেকে এ সংক্রান্ত মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক হিসাব রাখা শুরু হয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৬ সালে বজ্রপাতে প্রাণ হারান ৩৯১ জন, আর ২০২০ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪২৭-এ, যা এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে কিছুটা স্বস্তির খবরও রয়েছে। ২০২১ সালের পর থেকে মৃত্যুর হার ধীরে ধীরে কমছে এবং ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে ১৭৩ জনে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগাম সতর্কবার্তা, গণসচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপত্তা বার্তা পৌঁছে যাওয়ার কারণেই এই ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে।

বছরের মার্চ থেকে মে—কালবৈশাখীর মৌসুম—বাংলাদেশে বজ্রপাতের সবচেয়ে ভয়ংকর সময়। এ সময় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাশাপাশি নেত্রকোনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, যশোর ও মাদারীপুরেও ঝুঁকি বাড়ে। সবচেয়ে বেশি বিপদে থাকেন খোলা মাঠে কাজ করা কৃষক, ফসল রক্ষায় ব্যস্ত শ্রমজীবী মানুষ এবং নদী-হাওর বা জলাশয়ে থাকা জেলেরা।

বজ্রপাতের মতো আকস্মিক দুর্যোগে কয়েক সেকেন্ডের ভুলই কেড়ে নিতে পারে জীবন। তাই আবহাওয়া অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য বিভাগ জোর দিচ্ছে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার ওপর। বজ্রপাত শুরু হলে দালান বা কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ। খোলা মাঠ, জলাশয় এবং উঁচু গাছের নিচে অবস্থান বিপজ্জনক। আর যদি খোলা স্থানে আটকা পড়তে হয়, তাহলে পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে নিচু হয়ে বসে কানে আঙুল দিয়ে শরীর সুরক্ষিত রাখতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ঘরের ভেতরেও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও ধাতব বস্তু থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় বজ্রপাতের ঝুঁকি পুরো বাংলাদেশেই আরও বাড়তে পারে। তবে প্রযুক্তিনির্ভর আগাম সতর্কতা, স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা এবং নিরাপত্তা নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করা গেলে হাজারো প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব। প্রকৃতির এই হঠাৎ আঘাত পুরোপুরি থামানো না গেলেও প্রস্তুতি আর সচেতনতাই হতে পারে সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন