পরিবারের সুরক্ষায় এলপিজি ব্যবহারে জরুরি কিছু সতর্কতা
লিকুইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস—সংক্ষেপে এলপিজি—এখন দেশের প্রায় প্রতিটি পরিবারের রান্নাঘরের নিত্যসঙ্গী। একসময় পাইপলাইনের গ্যাস ছিল শহুরে জীবনের স্বাভাবিক সুবিধা, কিন্তু নতুন করে আবাসিক গ্যাস সংযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বাস্তবতা বদলে গেছে। রান্না থেকে শুরু করে চা বানানো, এমনকি ছোটখাটো অন্যান্য গৃহস্থালি কাজেও এখন নির্ভরতা এলপিজি সিলিন্ডারের ওপরই।
এর পেছনে কারণও স্পষ্ট। দ্রুত রান্না করা যায়, ব্যবহার তুলনামূলক সহজ, আর সহজলভ্য হওয়ায় শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই এর চাহিদা বাড়ছে। ব্যস্ত জীবনে সময় বাঁচানোর এই সুবিধাই এলপিজিকে করেছে জনপ্রিয়। তবে সুবিধার এই গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—নিরাপত্তা।
আমাদের রান্নাঘর মানেই সারাদিনের আনাগোনা। কখনো কেউ দুপুরের রান্নায় ব্যস্ত, কেউ বিকেলের নাশতা তৈরি করছেন, আবার শিশুরা কৌতূহল নিয়ে রান্নাঘরে ঢুঁ মারছে। এমন পরিবেশে সামান্য অসতর্কতাও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। গ্যাসের লিকেজ, চুলা ঠিকমতো বন্ধ না থাকা বা সিলিন্ডার ব্যবহারে অসাবধানতা—সবকিছুই ঝুঁকির মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। কয়েকটি সহজ নিয়ম মেনে চললেই আপনি নিজের পরিবারকে রাখতে পারেন নিরাপদ।
এলপিজি কেনার সময় যেসব বিষয় খেয়াল রাখবেন
- অনুমোদিত ডিলার বা পরিবেশকের কাছ থেকেই এলপিজি সিলিন্ডার কিনুন।
- অননুমোদিত দোকান থেকে নেওয়া সিলিন্ডার ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
- ডেলিভারির সময় সিলিন্ডারের সিল ও সেফটি ক্যাপ ঠিক আছে কি না দেখুন।
- সিল ভাঙা থাকলে সিলিন্ডার নেবেন না।
- সিলিন্ডারের গায়ে লেখা পরীক্ষার মেয়াদ (ডিএফটি) দেখে নিন। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলে সেই সিলিন্ডার ব্যবহার করা নিরাপদ নয়।
- নতুন সিলিন্ডার লাগানোর সময় জয়েন্টে সাবানের ফেনা লাগিয়ে গ্যাস লিক হচ্ছে কি না পরীক্ষা করুন।
- কখনোই আগুন দিয়ে গ্যাস লিক পরীক্ষা করবেন না।
রান্নার সময় যেসব সতর্কতা জরুরি
- রান্নাঘরের জানালা-দরজা খোলা রাখুন, যেন বাতাস চলাচল করতে পারে।
- চুলার কাছে প্লাস্টিক, কাগজ, কাপড় বা দাহ্য বস্তু রাখবেন না।
- রান্না করার সময় চুলা জ্বালিয়ে রেখে বাইরে চলে যাবেন না।
- সহজে আগুন ধরে, এমন ঢিলেঢালা পোশাক পরা এড়িয়ে চলুন।
- রান্না শেষে রেগুলেটরের নবটি অবশ্যই অফ করুন।
এলপিজি রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণ
- দীর্ঘদিন চুলা ব্যবহার না করলে রেগুলেটর খুলে সেফটি ক্যাপ লাগিয়ে রাখুন।
- সিলিন্ডার সব সময় সোজা অবস্থায় ও খোলা জায়গায় রাখুন।
- চুলার পাইপ বা সুরক্ষা টিউব প্রতিবছর বদলানো ভালো অভ্যাস।
- সব সময় আইএসআই বা মানসম্পন্ন পাইপ, রেগুলেটর ও চুলা ব্যবহার করুন।
- সিলিন্ডার বা যন্ত্রাংশে নিজে কোনো ধরনের কাটাছেঁড়া বা মেরামতের চেষ্টা করবেন না।
জরুরি পরিস্থিতিতে যা করতে হবে:
যদি গ্যাসের গন্ধ পান বা লিক সন্দেহ হয়—
- দ্রুত রেগুলেটর ও চুলার নব বন্ধ করুন।
- ভয় না পেয়ে সব দরজা-জানালা খুলে দিন, যেন বাতাস ঢোকে।
- ঘরের সব আগুন, মোমবাতি, কয়েল, আগরবাতি, ধূপ, চুলা নিভিয়ে ফেলুন।
- বিদ্যুতের সুইচ, ফ্যান, লাইট বা কোনো যন্ত্র স্পর্শ করবেন না।
- সম্ভব হলে বাইরে থেকে মেইন সুইচ বন্ধ করুন।
- ডিস্ট্রিবিউটর বা জরুরি সেবায় দ্রুত যোগাযোগ করুন।
মনে রাখবেন, এলপিজি বাতাসের চেয়ে ভারী, তাই এটি নিচে জমে থাকে। ভালোভাবে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করলে ঝুঁকি অনেকটাই কমে।
এলপিজি আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করেছে, রান্নাঘরে এনেছে গতি ও স্বস্তি। দ্রুত রান্না, সহজ ব্যবহার আর সহজলভ্যতার কারণে এটি এখন প্রায় প্রতিটি পরিবারের নির্ভরতার জায়গা। কিন্তু এই সুবিধার সঙ্গে জড়িয়ে আছে দায়িত্বও। কারণ, সামান্য অসতর্কতা থেকেই ঘটতে পারে বড় দুর্ঘটনা। তাই প্রয়োজন সচেতনতা ও অভ্যাসগত সতর্কতা। নিয়ম মেনে ব্যবহার, সচেতনতা ও নিয়মিত তদারকিই পারে আপনার পরিবারকে নিরাপদ রাখতে।
এসি//