কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার চর-গোরকমন্ডল এলাকায় ধরলা নদীর পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। গত এক সপ্তাহে তীব্র ভাঙনে অন্তত চারটি পরিবার তাদের বসতভিটা হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। একই সঙ্গে ভাঙনের মুখে রয়েছে প্রায় দেড় শতাধিক পরিবার, বিস্তীর্ণ ফসলি জমি এবং প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মুজিব কেল্লা।
স্থানীয়রা জানিয়েছে, নদীর আগ্রাসী ভাঙনে ইতোমধ্যে শত শত বিঘা আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ধরলার অব্যাহত ভাঙনে চর-গোরকমন্ডলের মানুষ এখন আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
তাদের একটাই দাবি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে যেন শেষ সম্বলটুকু রক্ষা করা হয়। না হলে নদীর গর্ভে হারিয়ে যাবে আরও অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন, স্মৃতি আর বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বনটুকুও।
নদী ভাঙনের সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন দিনমজুর মজনু সরকার (৪৮) ও তার পরিবার। জীবনের শেষ সম্বলটুকু আঁকড়ে ধরে রাখার শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
মজনু সরকার বলেন, এই বয়সে পাঁচ-ছয়বার নদীভাঙনের শিকার হয়েছি। জমিজমা সব নদী গিলে খেয়েছে। এখন শুধু বসতভিটাটুকু ছিল, সেটাও নদীর মুখে। বাধ্য হয়ে ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছি। কিন্তু নতুন করে ঘর তোলার মতো টাকা নেই। কীভাবে পরিবার নিয়ে বাঁচব, সেটাই এখন বড় দুচিন্তা।
তার স্ত্রী চাঁনবানু বেগম কান্না জড়িত কণ্ঠে অসহায়ত্ব আর আতঙ্ক নিয়ে তিনি বলেন, “চারদিকে শুধু পানি আর পানি। আরও পানি বাড়লে ঘরেও ঢুকে যাবে। দিনভর কোনো রকমে থাকলেও এক দুইটা মানুষের দেখা পাওয়া যায়, কিন্তু রাত নামলেই ভয় আরও বেড়ে যায়। কখন ভাঙন এসে ঘরটা নিয়ে যায় সেই আতঙ্কে ঘুমাতে পারি না। কখনো উঠানে দাঁড়িয়ে থাকি, কখনো পানির দিকে তাকিয়ে থাকি। আমাদের খোঁজ নেওয়ার মতো কেউ নেই।
চাঁনবানু বেগম আরও বলেন, “স্বামীর বয়স হয়েছে, আগের মতো কাজ করতে পারে না। আমি দিনমজুরের কাজ করে কোনো রকমে সংসার চালাই। সারাদিন পরিশ্রম করে বাড়ি ফিরে যদি নিজের ঘরেই নিরাপদে থাকতে না পারি, তাহলে এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে ? এখনো যদি ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাহলে হয়তো শেষ সম্বল এই ভিটাটুকু আমার রক্ষা পাবে।
একই এলাকার বাসিন্দা জহুরুল হক (৩৭) ও তার স্ত্রী মাহমুদা বেগম বলেন, “নদী ভাঙতে ভাঙতে এখন আমাদের বাড়ি থেকে মাত্র ২০ গজ দূরে চলে এসেছে। যেকোনো সময় বাড়িঘর নদীগর্ভে চলে যেতে পারে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আরও অনেক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
চরগোরকমন্ডল ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আয়াজ উদ্দিন জানান, মজনু সরকার ও চাঁনবানু বেগমের মতো কয়েকটি পরিবার ইতোমধ্যে ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। গত এক বছরে প্রায় শতাধিক পরিবার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে নিঃস্ব হয়েছে। কেউ সরকারি আবাসনের আঙিনায়, কেউ অন্যের জমিতে, আবার কেউ আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, নতুন করে পানি বৃদ্ধির ফলে গত এক সপ্তাহ ধরে ধরলার তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। বর্তমানে প্রায় দেড় শতাধিক পরিবার ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। পাশাপাশি প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মুজিব কেল্লাও হুমকির মুখে পড়েছে।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, চরগোরকমন্ডল এলাকায় ধরলা নদীর ভাঙন রোধে এক সপ্তাহ আগে দুই হাজার জিওব্যাগ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যদি এখনো কাজ শুরু না হয়ে থাকে, তবে দ্রুত কাজ শুরু করার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। তিনি আরও জানান প্রয়োজন হলে আরও জিওব্যাগ সরবরাহের ব্যবস্থাও নেওয়া হবে বলে।
আই/এ