জাতীয়

চার দশক পর ফিরছে গ্রাম সরকার, জনমত নেওয়ার উদ্যোগ

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও গ্রামীণ উন্নয়ন কার্যক্রমে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়াতে চার দশকের বেশি সময় পর আবারও গ্রাম সরকার ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ‘গ্রাম সরকার আইন ২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করে জনসাধারণের মতামত চেয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। আগামী ১৭ নভেম্বরের মধ্যে এ খসড়ার বিষয়ে মতামত জানাতে পারবেন নাগরিকরা।

স্থানীয় সরকার বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা ই-মেইল ঠিকানায় মতামত পাঠাতে হবে। নাগরিকদের মতামত পর্যালোচনার পর আইনের খসড়া চূড়ান্ত করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হবে।

নতুন প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন, স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ, মাদক ও জুয়া নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা, পরিবার পরিকল্পনা, পুষ্টি, টিকাদান ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় সহায়তা করবে গ্রাম সরকার। পাশাপাশি নিরাপদ পানি ও পয়োনিষ্কাশন, কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, সমবায়, কুটিরশিল্প, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নেও ভূমিকা রাখবে এ ব্যবস্থা।

এ ছাড়া স্থানীয় বিরোধ মীমাংসায় সহায়তা এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি ও আর্থিক কার্যক্রম পর্যালোচনার দায়িত্বও দেওয়া হচ্ছে গ্রাম সরকারকে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত ৫ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে গ্রাম সরকার পুনর্বহালের প্রস্তাব ওঠে। এরপর ২০০৯ সালে রহিত হওয়া ২০০৩ সালের গ্রাম সরকার আইন পরিমার্জন করে নতুন আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে। আইনটি পাস হলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের উদ্যোগে আবারও চালু হবে গ্রাম সরকার ব্যবস্থা।

নতুন খসড়ায় সময়ের প্রয়োজন বিবেচনায় বেশ কিছু দায়িত্ব যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সরকারের ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড ও ক্রীড়া কার্ড বিতরণ এবং এ-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহে সহায়তা। পাশাপাশি ভিজিএফ ও ভিজিডি কর্মসূচি বাস্তবায়ন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং ব্যক্তি পর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহারে জনগণকে উৎসাহিত করার দায়িত্বও রাখা হয়েছে।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সুশাসনকর্মী সাবেক সচিব একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, “নিঃসন্দেহে গ্রাম সরকার ব্যবস্থা ভালো উদ্যোগ। সরাসরি রাজনৈতিক ব্যক্তি ও জনগণের অংশগ্রহণের একটি পথ তৈরী হবে এই ব্যবস্থায়। এ জন্য সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব দিতে হবে। যদি গ্রাম সরকার ব্যবস্থা আইন মেনে চলে, তবে জনগণের দীর্ঘ দিনের রাজনীতি বিমুখতা দূর হবে।”

তবে স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে আইনের খসড়া তৈরির কাজ হয়েছে মাত্র। এটি এখনো চূড়ান্ত নয়। আইন হিসেবে কার্যকর করতে কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হবে। সংসদে পাস হওয়ার পরই সরকার এটি বাস্তবায়নে যেতে পারবে। কত দ্রুত ব্যবস্থা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করছে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের সিদ্ধান্তের ওপর।

ওয়ার্ডে ১৭ সদস্যের গ্রাম সরকার

‘গ্রাম সরকার আইন ২০২৬’-এর খসড়ায় দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ডে একটি করে গ্রাম সরকার গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে থাকবেন একজন প্রধান, একজন উপদেষ্টা ও ১৫ জন সদস্য। সব মিলিয়ে প্রতিটি গ্রাম সরকারে থাকবেন ১৭ জন।

প্রস্তাব অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য গ্রাম সরকারের প্রধান এবং সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্য উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। বাকি ১৫ জন সদস্য নির্বাচিত হবেন ওই ওয়ার্ডের ভোটারদের অংশগ্রহণে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোটের মাধ্যমে।

সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের মোট ভোটারের অন্তত ১০ শতাংশের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। গ্রাম সরকারের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর।

প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, সারা দেশে সাড়ে চার হাজারের বেশি ইউনিয়নের ৪১ হাজার ওয়ার্ডে প্রায় সাত লাখ স্থানীয় মানুষকে নিয়ে গ্রাম সরকার গঠন করা হবে।

সভা ও তহবিল ব্যবস্থাপনা

খসড়ায় গ্রাম সরকারের কার্যক্রম পরিচালনায় নিয়মিত সভার বিধান রাখা হয়েছে। প্রতি দুই মাসে অন্তত একবার গ্রাম সরকারের সভা করতে হবে। এ ছাড়া প্রতি ছয় মাসে অন্তত একটি সাধারণ সভা আয়োজন করতে হবে। সাধারণ সভায় ওয়ার্ডের মোট ভোটারের অন্তত ১০ শতাংশের উপস্থিতি থাকতে হবে।

গ্রাম সরকারের প্রতিটি দায়িত্ব বাস্তবায়নে আলাদা কমিটি গঠনের সুযোগ থাকবে। প্রয়োজন অনুযায়ী এসব কমিটির অধীনে উপকমিটিও গঠন করা যাবে।

এ ব্যবস্থার জন্য থাকবে পৃথক তহবিল। ইউনিয়ন পরিষদ ও অন্যান্য উৎস থেকে পাওয়া অর্থ ওই তহবিলে জমা হবে। গ্রাম সরকারের কার্যক্রম তদারকির ক্ষমতা থাকবে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও নারী ভাইস চেয়ারম্যান, পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের।

এ ছাড়া জেলা প্রশাসক তদন্ত করে প্রয়োজন মনে করলে গ্রাম সরকার বাতিল করতে পারবেন। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট গ্রাম সরকারকে কারণ দর্শানোর সুযোগ দিতে হবে।

যেভাবে শুরু হয়েছিল গ্রাম সরকার

বাংলাদেশে গ্রাম সরকার ব্যবস্থার সূচনা হয় বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের শাসনামলে। গ্রামীণ জনগণকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বনির্ভরতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে এ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল।

১৯৮০ সালের আইনের মাধ্যমে গ্রাম পর্যায়ে ব্যবস্থাটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে গ্রাম সরকার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী চালু করা হয়েছিল।

তবে ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর এ ব্যবস্থা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৯৮২ সালে এরশাদ সরকারের আমলে গ্রাম সরকার বিলুপ্ত করা হয়।

পরবর্তী সময়ে গ্রাম পর্যায়ে স্থানীয় সরকার কাঠামো ফিরিয়ে আনতে ১৯৯৭ সালে ‘স্থানীয় সরকার (গ্রাম পরিষদ) আইন’ প্রণয়ন করা হয়। এরপর ২০০৩ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে নতুন করে ‘গ্রাম সরকার আইন, ২০০৩’ করা হয়। ওই বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি আইনটি প্রণীত হয়েছিল।

সর্বশেষ ২০০৯ সালের ৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ‘গ্রাম সরকার (রহিতকরণ) বিল’ পাসের মাধ্যমে ব্যবস্থাটি বাতিল করা হয়। দীর্ঘ বিরতির পর এবার নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগের মধ্য দিয়ে গ্রাম সরকার ব্যবস্থা আবারও ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন