দাঙ্গায় উত্তাল ফ্রান্স, বিভিন্ন শহরে কারফিউ জারি
ফ্রান্সে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে ভয়াবহ দাঙ্গা ও লুটপাটের ঘটনার পর রাজধানী প্যারিসের দুটি এলাকায় রাতভর কারফিউ জারি করেছে পুলিশ। মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা এবং নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাতে জারি করা নির্দেশনা অনুযায়ী, রাত ১১টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট দুই এলাকায় কারফিউ কার্যকর থাকবে। এ সময় সেখানে প্রবেশ কিংবা অবস্থান করা নিষিদ্ধ। পাশাপাশি সন্ধ্যা ৮টা থেকে ওই এলাকাগুলোতে জমায়েত ও বিক্ষোভের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, শনিবারের বিক্ষোভের সময় প্যারিসের প্লাস দ্য লা রিপাবলিক এলাকায় দাঙ্গা এবং লে আল এলাকার বিভিন্ন দোকানে লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতেই এলাকাগুলোতে কারফিউ জারি করা হয়েছে।
এর আগে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু নির্দিষ্ট স্থান ও সীমিত পরিসরে কারফিউ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। উত্তরাঞ্চলীয় শহর লিলসহ কয়েকটি শহরে ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোমবার থেকে পরবর্তী দুই দিন রাত ৮টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করা হয়েছে। ফরাসি রিভিয়েরা অঞ্চলের নিস শহরেও অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য রাত ৯টা থেকে কারফিউ কার্যকর হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু বলেন, ব্যাপক সহিংসতা ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হলেও কেউ নিহত হননি, যা অলৌকিক ঘটনার মতো। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কী ধরনের কারফিউ প্রয়োজন, তা নিয়ে মেয়রদের সঙ্গে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পদত্যাগের প্রস্তাব গ্রহণ করেননি ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ
দাঙ্গার ঘটনায় দায় নিয়ে রোববার (১৮ অক্টোবর) পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছিলেন ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেতৃত্বে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি বিবেচনায় তার পদত্যাগ গ্রহণ করেননি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ।
সোমবার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়, সহিংসতার আগে পরিকল্পনা ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে কোথায় ঘাটতি ছিল, তা তদন্ত করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন ম্যাক্রোঁ। একই সঙ্গে দ্রুত নতুন পুলিশি কৌশল চালুর নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।
রোববার সন্ধ্যায় প্যারিস, লিয়ঁ ও মার্সেইসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের কয়েকটি দল ময়লার পাত্র, সাইকেল ও অন্যান্য জিনিসে আগুন ধরিয়ে দেয়। বিভিন্ন দোকানেও লুটপাট চালানো হয়। এর আগে শনিবার জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুরবস্থার প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভ হয়েছিল।
কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, এসব ঘটনায় ফ্রান্সজুড়ে অন্তত ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সোমবার জানানো হয়, বিভিন্ন শহরে অন্তত ৩ হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অথবা লুটপাটের শিকার হয়েছে। এদিকে মার্সেইয়ে সোমবার দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বিক্ষোভ ও অন্যান্য জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়।
একটি বেতারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ বলেন, চলমান পরিস্থিতির জন্য নিজেকে দায়ী মনে করেই তিনি পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো। বিক্ষোভের প্রস্তুতি ও আগাম পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে আরও কার্যকর হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নুনেজের অভিযোগ, লুটপাটকারীদের পাশাপাশি কট্টর বামপন্থী কর্মীরাও দাঙ্গায় জড়িত। দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে তৎপরতা চালানো এসব দলের মোকাবিলায় পুলিশের কৌশল পরিবর্তন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
লুটপাটে ক্ষতিগ্রস্ত দোকান, আগুনে পুড়েছে পৌর ভবন
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কয়েক শ মানুষের দল বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। এ সময় নগর ভবনসহ সরকারি স্থাপনা ও কার্যালয়েও হামলার ঘটনা ঘটে।
মধ্য ফ্রান্সের লিমোজ শহরে ঊনবিংশ শতাব্দীর একটি পৌর ভবনে আগুন লাগে। এতে ভবনটির ছাদ ধসে পড়ে এবং স্থাপনাটি প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়।
সোমবার প্যারিসের বিভিন্ন সড়কে পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও দমকলকর্মীদের ভাঙা কাচসহ অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ সরাতে দেখা যায়।
প্লাস দ্য লা রিপাবলিক এলাকার কাছে একটি ভিডিও গেমের দোকানের মালিক উরি জাগুরি জানান, শনিবার বিকেলে তিনি দোকান বন্ধ করে চলে যান। পরে নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজে দেখতে পান, লুটপাটকারীরা জোর করে দোকানে প্রবেশ করছে। তিনি পুলিশকে ফোন করলে তাঁকে হস্তক্ষেপ না করতে বলা হয়। পুলিশ আসবে বলে জানানো হলেও শেষ পর্যন্ত কেউ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ বিরোধীদের
দাঙ্গা ও লুটপাটের ঘটনায় সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেছেন কট্টর ডানপন্থী দল ন্যাশনাল র্যালির সভাপতি জর্দান বারদেলা।
তিনি বলেন, ফরাসি জনগণকে সুরক্ষা দেওয়া রাষ্ট্রপ্রধানের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান—উভয়েই সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন।
বারদেলা ফ্রান্সের জনগণকে বিক্ষোভের পাশাপাশি ভোটের মাধ্যমেও নিজেদের মত প্রকাশের আহ্বান জানান। আগামী বসন্তে অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নেওয়া দলটির নেতা মারিন ল্য পেনের সঙ্গে প্রচার চালাচ্ছেন তিনি।
বিভিন্ন জনমত জরিপে ল্য পেনকে আসন্ন নির্বাচনে এগিয়ে থাকা সম্ভাব্য প্রার্থীদের একজন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সূত্র: এপি
এসি//