দুর্গাপূজায় পশ্চিমবঙ্গের যে গ্রামগুলোতে নামে শোকের ছায়া
চারদিকে ঢাকের শব্দ, আলোর ঝলকানি, মণ্ডপে মণ্ডপে দেবী দুর্গার আরাধনা। কিন্তু এই উৎসবের মধ্যেই এমন কিছু জনপদ রয়েছে, যেখানে দুর্গাপূজার দিনগুলো কাটে নীরবতায়। কোথাও বন্ধ থাকে ঘরের দরজা, কোথাও কালো কাপড় পরে শোক পালন করেন মানুষ। তাদের কাছে মহিষাসুর কোনো অসুর নন, বরং পূর্বপুরুষ। আর দুর্গাপূজা? তাদের বিশ্বাসে, এই সময়টি শোক স্মরণের।
পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ার ও ডুয়ার্সের বিভিন্ন চা-বাগান এলাকা থেকে শুরু করে ঝাড়খণ্ডের কিছু জনপদে বসবাস করেন অসুর জনগোষ্ঠীর মানুষ। তাদের নিজস্ব বিশ্বাস ও লোককথায় মহিষাসুরের পরিচয় প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনির চেয়ে আলাদা। যে মহিষাসুরকে দেবী দুর্গার হাতে নিহত অসুররাজ হিসেবে বর্ণনা করা হয়, তাকেই তারা নিজেদের পূর্বপুরুষ ও একসময়কার শাসক বলে মনে করেন।
অসুর জনগোষ্ঠীর একটি অংশ দুর্গাপূজার দিনগুলোতে আনন্দ-উৎসব থেকে দূরে থাকেন। কোথাও ঘরের বাইরে যাওয়া কমিয়ে দেন, কোথাও কালো পোশাক পরে শোকের আবহ বজায় রাখেন। তাদের বিশ্বাস, মহিষাসুরের মৃত্যু তাদের পূর্বপুরুষের পরাজয় ও হত্যার স্মৃতি বহন করে। তাই অন্যদের কাছে যে সময় আনন্দের, তাদের কাছে তা বেদনার।
তবে সব অসুর পরিবার একইভাবে এই রীতি পালন করে না। অঞ্চল, পারিবারিক বিশ্বাস ও প্রজন্মভেদে আচার-আচরণেও পার্থক্য রয়েছে।
অসুরদের পরিচয় কেবল এই বিশ্বাসে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক রীতি ও উৎসব রয়েছে। সারনা ধর্মীয় বিশ্বাস এবং নবান্নের মতো কৃষিভিত্তিক উৎসব তাদের জীবনযাপনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রকৃতি, পূর্বপুরুষ ও সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যের সঙ্গে তাদের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গভীর।
অসুর জনগোষ্ঠীর প্রচলিত কাহিনিতে মহিষাসুরকে শক্তিশালী শাসক ও নিজেদের পূর্বপুরুষ হিসেবে স্মরণ করা হয়। তাদের বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আর্য-অনার্য সংঘাতের ধারণাও। তবে এসব কাহিনি মূলত সম্প্রদায়ের লোকবিশ্বাস ও মৌখিক ঐতিহ্যের অংশ; এগুলোর সবকিছুকে প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এই ভিন্ন স্মৃতিই দুর্গাপূজাকে ঘিরে তাদের অবস্থানকে আলাদা করে তুলেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে যে কাহিনি দেবীর বিজয়ের, অসুরদের কাছে সেই কাহিনির অন্য একটি দিক রয়েছে—পরাজিত বলে বিবেচিত এক জনগোষ্ঠীর স্মৃতি ও আত্মপরিচয়।

সময়ের সঙ্গে অসুর সম্প্রদায়ের জীবনেও পরিবর্তন আসছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, শহরমুখী জীবন এবং অন্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ঐতিহ্য পালনের ধরনেও ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। কেউ পূর্বপুরুষের বিশ্বাস আঁকড়ে রাখতে চান, কেউ আবার বৃহত্তর সামাজিক উৎসবের সঙ্গে নিজেদের জীবনকে মেলানোর চেষ্টা করছেন।
তবে এই পরিবর্তনের মধ্যেও নিজেদের পরিচয় ও ইতিহাসের স্মৃতি ধরে রাখার চেষ্টা করছেন অনেকে। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠন ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীও নিজেদের ঐতিহ্য তুলে ধরতে কাজ করছে।
পুরুলিয়ার মতো অঞ্চলে আদিবাসী সমাজের নিজস্ব সাংস্কৃতিক আয়োজন, শিকারকেন্দ্রিক ঐতিহ্যের স্মরণ এবং দশাই নাচ বা দশাই পরবের মতো অনুষ্ঠানও সম্প্রদায়গত পরিচয়ের অংশ। এসব আয়োজনের ধরন ও তাৎপর্য অবশ্য জনগোষ্ঠীভেদে আলাদা।
দুর্গাপূজা বাংলার অন্যতম বড় উৎসব। কিন্তু এই উৎসবের অর্থ সবার কাছে এক নয়। অসুর জনগোষ্ঠীর একটি অংশের কাছে মহিষাসুরের স্মরণ তাদের পূর্বপুরুষ, সংস্কৃতি ও নিজস্ব ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকার একটি উপায়।
প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনিতে মহিষাসুর পরাজিত অসুররাজ। কিন্তু অসুর সম্প্রদায়ের অনেক মানুষের বিশ্বাসে, তিনি তাদের পূর্বপুরুষ ও হারিয়ে যাওয়া এক বীর। এই ভিন্ন বিশ্বাসের মধ্য দিয়েই দুর্গাপূজাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে তাদের স্বতন্ত্র শোকের ঐতিহ্য।
প্রতি বছর দুর্গাপূজা আসে, কয়েক দিনের উৎসব শেষে মণ্ডপের আলো নিভে যায়, থেমে যায় ঢাকের বাদ্য। কিন্তু অসুর সম্প্রদায়ের মানুষের জীবন, বিশ্বাস ও সংস্কৃতিতে হুদুড় দুর্গা তথা মহিষাসুরের স্মৃতি রয়ে যায় গভীরভাবে। তাদের কাছে তাকে স্মরণ করা কেবল অতীতকে মনে করা নয়, বরং নিজেদের পূর্বপুরুষ ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখারও এক উপায়।
এসি//