বিনোদন

মারা গেলেন যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় ধর্মীয় টেলিভিশন উপস্থাপক জিম বাকার

যুক্তরাষ্ট্রের খ্রিষ্টান ধর্মীয় টেলিভিশনের পরিচিত মুখ জিম বাকার আর নেই। একসময় বিপুল জনপ্রিয় ধর্মীয় অনুষ্ঠান উপহার দিয়ে বড় একটি ধর্মীয় সম্প্রচার সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন তিনি। তবে যৌন কেলেঙ্কারি ও আর্থিক অপরাধের ঘটনায় পরবর্তী সময়ে হারান খ্যাতি, সম্পদ ও সেই সাম্রাজ্য। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর।

সোমবার (০৫ অক্টোবর) মারা যান জিম বাকার। তার দ্বিতীয় স্ত্রী লরি বাকার এক বিবৃতিতে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। তবে মৃত্যুর কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

লরি বাকার বলেন, জিম ছিলেন খ্রিষ্টান টেলিভিশনের একজন পথিকৃৎ। তবে তার কাছে জিমের পরিচয় ছিল আরও ব্যক্তিগত- তিনি ছিলেন তার স্বামী, সবচেয়ে ভালো বন্ধু এবং জীবনের বিভিন্ন সময়ের বিশ্বস্ত সঙ্গী।

দ্বিতীয় স্ত্রী লরিকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের ব্র্যানসন শহরের কাছে বসবাস করতেন জিম। ২০০৩ সালে শুরু হওয়া ‘দ্য জিম বাকার শো’ সেখান থেকেই ধারণ করা হতো। ২০২০ সালে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি।

তবে জিম বাকারের সবচেয়ে বড় পরিচিতি আসে প্রথম স্ত্রী ট্যামি ফেই বাকারের সঙ্গে পরিচালিত ‘দ্য পিটিএল ক্লাব’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। একপর্যায়ে অনুষ্ঠানটির দর্শকসংখ্যা এতটাই বেড়ে যায় যে প্রতিরাতে প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ মানুষ এটি দেখতেন।

১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে জিম ও ট্যামি ফেইয়ের ধর্মীয় কর্মকাণ্ড আরও বিস্তৃত হয়। টেলিভিশন অনুষ্ঠান পরিচালনার পাশাপাশি দক্ষিণ ক্যারোলিনার ফোর্ট মিলে তারা গড়ে তোলেন ধর্মভিত্তিক একটি বিনোদন পার্ক ও হোটেল। অনুসারীদের কাছ থেকেও আসতে থাকে বিপুল অর্থ।

কিন্তু সাফল্যের সেই সময় বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। যৌন কেলেঙ্কারি ও আর্থিক অপরাধের ঘটনায় জিম বাকারের গড়ে তোলা সাম্রাজ্যে ধস নামে। হারান সম্পদ ও প্রভাব, আর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি।

মিশিগানের মাসকিগনে জন্ম জিম বাকারের। মিনেসোটার মিনিয়াপোলিসের নর্থ সেন্ট্রাল বাইবেল কলেজে পড়ার সময় ট্যামি ফেইয়ের সঙ্গে তার পরিচয়। ১৯৬১ সালে বিয়ে করেন তারা।

বিয়ের পর দুজনেই পড়াশোনা ছেড়ে ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। জিম ধর্মীয় বক্তব্য দিতেন, আর ট্যামি ফেই গান গাওয়ার পাশাপাশি অ্যাকর্ডিয়ন বাজাতেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় গির্জা ও ধর্মীয় সমাবেশে অংশ নিয়ে তারা নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে যান।

তাদের কর্মকাণ্ড একসময় খ্রিষ্টান টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব প্যাট রবার্টসনের নজরে আসে। ১৯৬৫ সালে রবার্টসনের খ্রিষ্টান সম্প্রচার নেটওয়ার্কে শিশুদের জন্য একটি অনুষ্ঠান শুরু করেন তারা। পরের বছর জিম ‘দ্য সেভেন হান্ড্রেড ক্লাব’ নামের ধর্মীয় আলোচনা অনুষ্ঠান উপস্থাপনা শুরু করেন।

১৯৭২ সালে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে যান জিম। দুই বছর পর প্রতিষ্ঠা করেন ‘পিটিএল স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক’। এর প্রধান অনুষ্ঠান ছিল ‘দ্য পিটিএল ক্লাব’। পিটিএল-এর পূর্ণ অর্থ ‘প্রেইজ দ্য লর্ড’, অর্থাৎ ‘প্রভুর প্রশংসা’।

১৯৮০-এর দশকে ‘দ্য পিটিএল ক্লাব’ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম জনপ্রিয় ধর্মীয় টেলিভিশন অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। লাখ লাখ দর্শক নিয়মিত অনুষ্ঠানটি দেখতেন। বিভিন্ন অতিথি ও খ্রিষ্টান শিল্পীদের সঙ্গে আলোচনা, জিমের ধর্মীয় বক্তব্য এবং ট্যামি ফেইয়ের সংগীত পরিবেশনা ছিল অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ।

ট্যামি ফেই নিজেও হয়ে উঠেছিলেন আলোচিত এক চরিত্র। গান গাওয়ার পাশাপাশি তার ভারী সাজসজ্জা ও ঘন মাশকারার ব্যবহার তাকে দর্শকদের কাছে আলাদা করে পরিচিত করে তোলে।

অন্যদিকে বিপুল সম্পদ ও বিলাসবহুল জীবনযাপনের কারণে সময়ের সঙ্গে জিম ও ট্যামি ফেইকে নিয়ে শুরু হয় নানা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে রাতের টেলিভিশন অনুষ্ঠানগুলোতে তাদের নিয়ে নিয়মিত রসিকতা করা হতো। জনপ্রিয় হাস্যরসাত্মক অনুষ্ঠান ‘স্যাটারডে নাইট লাইভ’-এও তাদের অনুকরণ করা হয়।

জিম ও ট্যামি ফেই বাকারের আলোচিত জীবন পরে উঠে আসে চলচ্চিত্রেও। তাদের জীবনকাহিনি অবলম্বনে নির্মিত ‘দ্য আইজ অব ট্যামি ফেই’ মুক্তি পায় ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে।

বিপুল জনপ্রিয়তা থেকে বিতর্ক, পতন এবং শেষ জীবনে আবার টেলিভিশনে ফেরার চেষ্টার মধ্য দিয়ে জিম বাকারের জীবন যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় সম্প্রচার জগতের এক আলোচিত অধ্যায় হয়ে থাকবে।

সূত্র: সিবিএস নিউজ

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন