ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ডের চার দিন পরও অচেতন আসামি
যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার চার দিন পরও জ্ঞান ফেরেনি ক্রিস্টা পাইকের। হাসপাতালে অচেতন অবস্থায় কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্রের সহায়তায় চিকিৎসা চলছে ৫০ বছর বয়সী এই নারীর। চিকিৎসকেরা তার শরীরে দেয়া অতিরিক্ত মাত্রার ঘুমপাড়ানি ওষুধ পেন্টোবারবিটাল অপসারণের চেষ্টা করছেন।
পাইকের আইনজীবী স্টিফেন ফেরেল জানিয়েছেন, তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন কি না, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। পরিস্থিতি স্পষ্ট হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
রোববার (৪ অক্টোবর) মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ অনুষ্ঠানে ফেরেল বলেন, ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টার পর পাইক আর কখনো জ্ঞান ফিরে পেয়েছেন কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।
গত বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় পাইককে দুই দফায় প্রাণঘাতী ওষুধের ইনজেকশন দেওয়া হয়। তবে পেন্টোবারবিটাল প্রয়োগের পরও তার মৃত্যু হয়নি। আইনজীবীদের দাবি, ওষুধ প্রয়োগের কারণে তার দুই হাতে গুরুতর ক্ষত ও ফোসকা তৈরি হয়েছে।
চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন অন্য ব্যক্তি
ফেরেল জানান, আগে থেকেই পাইক তার চিকিৎসাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আইনি ক্ষমতা অন্য একজনকে দিয়ে রেখেছিলেন। বর্তমানে ওই ব্যক্তিই তার চিকিৎসার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কারণে তার পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টার পর পাইকের শারীরিক অবস্থা নিয়ে খুব সীমিত তথ্যই প্রকাশ করেছে কর্তৃপক্ষ। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে তাকে হাসপাতালে রাখা হয়েছে।
ফেরেল বলেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টার সময় পাইক কী ধরনের শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তিনি পুরোপুরি সুস্থ হতে পারবেন কি না, সেটিও কয়েক দিন পর আরও পরিষ্কার হতে পারে।
রোববার পাইকের আইনজীবী দল তার ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নথি প্রকাশের দাবি
৩০ সেপ্টেম্বর পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময়সূচি আট ঘণ্টারও বেশি পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এর আগে তার আইনজীবীরা আদালতে যুক্তি দেন, শৈশবে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার বিষয়টি মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সময় বিচারকেরা যথাযথভাবে বিবেচনা করেছিলেন কি না, তা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে নিম্ন আদালত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত দিলেও পরে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট সেই স্থগিতাদেশ বাতিল করে। এরপরই পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
শুক্রবার ২ অক্টোবর তার আইনজীবীরা আদালতে আবেদন করে টেনেসি কারা কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের লিখিত নথি, সংশ্লিষ্ট যোগাযোগের তথ্য, ছবি ও ভিডিও সংরক্ষণের নির্দেশ চেয়েছেন।
ফেরেল সিএনএনকে বলেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় কী ঘটেছে, সে বিষয়ে টেনেসি কর্তৃপক্ষকে আরও স্বচ্ছ হতে হবে। রাষ্ট্র জনগণের নামে কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করছে, সে সম্পর্কে জনগণের জানার অধিকার রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
টেনেসিতে দ্বিতীয়বার ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ড
চলতি বছরে টেনেসিতে এটি দ্বিতীয় ঘটনা, যেখানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের শেষ পর্যায়ে গিয়ে প্রক্রিয়া সফল হয়নি।
এর আগে মে মাসে টনি কারাথার্সের মৃত্যুদণ্ডও কার্যকর করা যায়নি। কারা কর্মকর্তারা তার ডান হাতে শিরাপথে ওষুধ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারলেও দ্বিতীয় একটি শিরাপথ স্থাপনে ব্যর্থ হন। পরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করা হয়।
এই ঘটনার পর টেনেসি সংশোধন বিভাগের কমিশনার ফ্র্যাঙ্ক স্ট্রাডা শনিবার পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন।
টেনেসির গভর্নর বিল লি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পুরো ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্বাধীন তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। সাবেক মার্কিন অ্যাটর্নি এড স্ট্যানটন তদন্তের দায়িত্ব পালন করবেন।
২০২২ সালে আরেক বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়ায় ত্রুটি ধরা পড়ার পরও গভর্নর লি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই তদন্তে দেখা যায়, রাজ্য কর্তৃপক্ষ প্রাণঘাতী ইনজেকশন প্রয়োগের জন্য নিজেদের নির্ধারিত নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করেনি।
পাইককে হাসপাতালে নেওয়ার পর তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে টেনেসি কারা কর্তৃপক্ষ কিংবা রাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকে বিস্তারিত কোনো তথ্য জানানো হয়নি।
জ্ঞান ফিরলে কী হবে, এখনো অনিশ্চিত
পাইক সুস্থ হয়ে উঠলে তার মৃত্যুদণ্ডের মামলায় পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। এরই মধ্যে তার আইনজীবীরা গভর্নরের কাছে মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার আবেদন করেছেন।
১৯৯৫ সালে ১৯ বছর বয়সী সহপাঠী কোলিন স্লেমারকে হত্যার অভিযোগ পাইক অস্বীকার করেননি। দুজনই নক্সভিলের একটি চাকরিমুখী প্রশিক্ষণকেন্দ্রে পড়াশোনা করতেন।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, স্লেমারকে নিজের প্রেমের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করতেন পাইক। পরে পাইক ও তার প্রেমিক তাকে একটি নির্জন এলাকায় নিয়ে যান। সেখানে ধারালো একটি কাটার যন্ত্র দিয়ে স্লেমারকে আঘাত করা হয়। পরে বড় একটি পিচঢালা রাস্তার পাথর দিয়েও তাকে আঘাত করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা, জড়িতদের বয়স এবং নিহতের শরীরে শয়তানপূজার একটি প্রতীক খোদাই করার ঘটনা মামলাটিকে সে সময় ব্যাপক আলোচনায় নিয়ে আসে।
সূত্র: এনবিসি নিউজ
এসি//