মার্কিন ভোটারদের উদ্দেশে ইরানের খোলা চিঠি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের বিরুদ্ধে এবার সরাসরি মার্কিন নাগরিকদের অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি। দেশটির নাগরিকদের উদ্দেশে দেওয়া এক খোলা চিঠিতে মার্কিন ভোটারদের ‘জেগে ওঠার’ পাশাপাশি দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিকদের কাছ থেকে দেশের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত দীর্ঘ ওই চিঠিতে ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধনীতি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মার্কিন সরকার নাগরিকদের বিভ্রান্ত করছে বলে অভিযোগ করেছে আইআরজিসি।
বাহিনীটির দাবি, বর্তমান মার্কিন প্রশাসনে পরিবর্তন প্রয়োজন।
চিঠিতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের পরিস্থিতি নিয়েও নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে আইআরজিসি।
তাদের দাবি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা এবং দেশটির সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার মতো যেসব লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল নির্ধারণ করেছিল, সেগুলো অর্জিত হয়নি।
আইআরজিসি স্বীকার করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি স্থাপনা এবং কিছু আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এসব হামলার পরও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেছে তারা।
চিঠিতে ইরানের জনগণ ও মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে কিছু অভিন্ন সমস্যার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
আইআরজিসির দাবি, দুই দেশের সাধারণ মানুষই ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও যুদ্ধনীতির কারণে ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

চিঠি প্রকাশের দিনই আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি ট্রাম্পকে মিথ্যাবাদী হিসেবে আখ্যা দেন।
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের যে ক্ষতি হচ্ছে, সে সম্পর্কে তারা পুরোপুরি অবগত নন।
আইআরজিসির বক্তব্য, মার্কিন নাগরিকরা পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও জানলে প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারেন।
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর অন্যতম কারণ হিসেবে দেশটির সম্ভাব্য পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার কথা বলে আসছেন ট্রাম্প। তবে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে—এমন অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে তেহরান।
দেশটির দাবি, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক কাজে ব্যবহারের জন্য পরিচালিত হচ্ছে।
যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হরমুজ প্রণালি।
বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে ইরানের নিয়ন্ত্রণ ও জাহাজ চলাচল নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য রয়েছে।
আইআরজিসির মুখপাত্র মোহেবি দাবি করেছেন, হরমুজে ইরানের প্রভাব এখনো যথেষ্ট রয়েছে। যুদ্ধের পর ইরান এই জলপথে জাহাজ চলাচল সীমিত করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রও তেল পরিবহন সচল রাখতে সামরিক তৎপরতা বাড়িয়েছে।
তবে কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ কোটি ৩২ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগের দৈনিক রপ্তানির তুলনায় এটি প্রায় ৭৭ শতাংশ।
এদিকে আইআরজিসির এই চিঠি প্রকাশের পরদিনই ইরাক থেকে অবশিষ্ট মার্কিন সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর ইরাকে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের শেষ সামরিক ঘাঁটিগুলো থেকেও সেনা সরিয়ে নেওয়া হয়। তেহরান এই প্রত্যাহারকে নিজেদের আঞ্চলিক অবস্থানের সাফল্য হিসেবে দেখছে।
অন্যদিকে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধ থামাতে কাতার মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দুই পক্ষের সঙ্গে আলাদাভাবে যোগাযোগ করছেন কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় আলোচনা জোরালো হলেও এখন পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি।
এর মধ্যেই ট্রাম্প আবারও বলেছেন, ইরান খুব দ্রুত আত্মসমর্পণ করবে এবং যুদ্ধ শিগগির শেষ হবে। তবে ইরান এখনো নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি।
ফলে একদিকে মার্কিন নাগরিকদের উদ্দেশে আইআরজিসির সরাসরি রাজনৈতিক বার্তা, অন্যদিকে কাতারের মধ্যস্থতায় যুদ্ধ বন্ধের চেষ্টা—দুই পথেই এখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের পরবর্তী গতি নির্ধারণের চেষ্টা চলছে।
সূত্র: রয়টার্স
এসি//