অপূর্ণতা থেকে পূর্ণতার দীর্ঘ যাত্রায় শেষ হলো নীল-সাদা জার্সিতে মেসির অধ্যায়
আন্তর্জাতিক ফুটবলে লিওনেল মেসির অধ্যায় শেষ। ৩৯ বছর বয়সে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখার ঘোষণা দিয়েছেন ফুটবলের এই মহাতারকা। ২০০৫ সালে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, দুই দশকের বেশি সময় পর তার শেষ হলো বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলে।
আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল করেছেন মেসি। তবে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এই গল্পে আছে শৈশবের স্বপ্ন, অসাধারণ সাফল্য, একের পর এক হতাশা, তীব্র সমালোচনা, অভিমান, ফিরে আসা এবং শেষ পর্যন্ত দেশের হয়ে কাঙ্ক্ষিত সব শিরোপা জয়ের পূর্ণতা।

১৯৮৭ সালের ২৪ জুন আর্জেন্টিনার রোজারিওতে জন্ম লিওনেল আন্দ্রেস মেসির। ছোটবেলা থেকেই ফুটবল ছিল তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে স্থানীয় ক্লাব গ্রান্দোলিতে শুরু হয় ফুটবলের হাতেখড়ি। এরপর নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের বয়সভিত্তিক দলে খেলতে খেলতেই তার প্রতিভা নজর কাড়ে।
তবে মেসির পথচলা সবসময় সহজ ছিল না। শারীরিক বৃদ্ধির সমস্যার কারণে তার চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল। ১৩ বছর বয়সে স্পেনে পাড়ি দিয়ে বার্সেলোনার বিখ্যাত যুব একাডেমি লা মাসিয়ায় যোগ দেন তিনি। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা হয়ে ওঠেন।
বল পায়ে অসাধারণ গতি, ড্রিবলিং, ভারসাম্য ও খেলার প্রতি সহজাত বোধ তাকে খুব দ্রুতই অন্যদের থেকে আলাদা করে দেয়। বার্সেলোনার মূল দলে জায়গা পাওয়ার পর শুরু হয় সাফল্যের এক দীর্ঘ অধ্যায়।

ক্লাবটির হয়ে একের পর এক শিরোপা জেতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত অর্জনেও নিজেকে নিয়ে যান অনন্য উচ্চতায়। আটবার ব্যালন ডি’অর জয় তার শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম বড় স্বীকৃতি। একসময় তাকে সর্বকালের সেরাদের সঙ্গে তুলনা করা শুরু হয়।
কিন্তু ক্লাব ফুটবলে যতই সাফল্য আসছিল, আর্জেন্টিনার জার্সিতে একটি প্রশ্ন ততই বড় হয়ে উঠছিল—দেশের হয়ে বড় কোনো শিরোপা কবে জিতবেন মেসি? বারবার ফাইনাল, বারবার হতাশা
২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলে অভিষেকও সুখকর ছিল না। হাঙ্গেরির বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচে মাঠে নেমে অল্প সময়ের মধ্যেই লাল কার্ড দেখতে হয়েছিল তাকে।
এরপর জাতীয় দলের হয়ে একের পর এক বড় টুর্নামেন্ট খেলেছেন। কিন্তু শিরোপা যেন বারবার দূরে সরে গেছে।

২০০৭ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলের কাছে হার। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে অতিরিক্ত সময়ে পরাজয়। এরপর ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে টানা দুবার চিলির কাছে হার। চারটি বড় ফাইনাল, চারবারই হতাশা।
২০১৬ সালের সেই হতাশার পর মেসি জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন। তখন তার বয়স মাত্র ২৯ বছর।
বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হয়েও দেশের হয়ে বড় কোনো শিরোপা না জেতার আক্ষেপ তাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছিল তাকে। ক্লাবের হয়ে সবকিছু জিতলেও আর্জেন্টিনার হয়ে পারেননি—এমন কথাও শুনতে হয়েছে তাকে।

কিন্তু সেই অধ্যায় সেখানেই শেষ হয়নি। ফিরে এসে বদলে দিলেন গল্প
মেসি ফিরে এলেন জাতীয় দলে। আর সেই ফেরার পরই বদলে যেতে শুরু করল তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।
২০২১ কোপা আমেরিকার ফাইনাল। প্রতিপক্ষ ব্রাজিল, ভেন্যু মারাকানা। এবার আর অপেক্ষা বাড়েনি। আর্জেন্টিনা ১-০ গোলে ব্রাজিলকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হলো।
মেসির হাতে উঠল জাতীয় দলের হয়ে প্রথম বড় শিরোপা।
যে ট্রফির জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল, যে ব্যর্থতার কারণে তাকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল—শেষ পর্যন্ত সেই ট্রফিই তার হাতে এল। এরপর যেন সবকিছুই বদলে গেল।

২০২২ সালে ফাইনালিসিমা জিতল আর্জেন্টিনা। একই বছর কাতার বিশ্বকাপে মেসির নেতৃত্বে দলটি পৌঁছে গেল ফাইনালে।
ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই ফাইনাল আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ম্যাচ। ৩-৩ গোলে সমতা থাকার পর টাইব্রেকারে জয় পায় আর্জেন্টিনা।
আর মেসির হাতে উঠল সেই বিশ্বকাপ ট্রফি, যেটি নিয়ে তার ক্যারিয়ারকে এতদিন প্রশ্ন করা হয়েছিল।
ম্যারাডোনার পর আবারও বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনায়। আর মেসি পেলেন তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত অর্জন।
বিশ্বকাপ জয়ের পরও থামেননি মেসি। ২০২৪ সালে আর্জেন্টিনাকে আরও একটি কোপা আমেরিকা শিরোপা এনে দেন তিনি।

একসময় যে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে ‘অপূর্ণ’ বলা হতো, সেই মেসিই শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার ইতিহাসের অন্যতম সফল অধিনায়ক হয়ে ওঠেন।
২০২৬ বিশ্বকাপ ছিল তার শেষ বিশ্বকাপ। ৩৯ বছর বয়সেও আর্জেন্টিনাকে নিয়ে তিনি পৌঁছে যান ফাইনালে।
তবে এবার শেষটা হলো হতাশায়। স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে বিশ্বকাপের শিরোপা হাতছাড়া করে আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচই হয়ে রইল জাতীয় দলের জার্সিতে মেসির শেষ ম্যাচ।
এরপর ৩১ আগস্ট আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন তিনি।

মেসিকে শুধু আটটি ব্যালন ডি’অর, বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা কিংবা ১২৫ আন্তর্জাতিক গোল দিয়ে বোঝানো কঠিন।
তার গল্পে আছে রোজারিওর সেই ছোট্ট ছেলেটি, যে ফুটবলকে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন বানিয়েছিল। আছে বার্সেলোনার হয়ে বিশ্ব জয় করা এক অসাধারণ প্রতিভা। আছে জাতীয় দলের হয়ে একের পর এক ফাইনালে হেরে যাওয়া একজন হতাশ অধিনায়ক।
এমএ//