আন্তর্জাতিক

ইরানের উপর নতুন করে মার্কিন বিমান হামলা

হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে তীব্র সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। ইরানের ওপর ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে তেহরান। পরিস্থিতির ফলে দুই দেশের মধ্যকার নাজুক যুদ্ধবিরতি চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ ও বেসামরিক নাবিকদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার লক্ষ্যে রোববার (১২ জুলাই) গ্রিনিচ মান সময় রাত নয়টা থেকে নতুন দফায় বিমান অভিযান শুরু করা হয়েছে।

সেন্টকমের দাবি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশেই এই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। হামলার বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা তাদের চরম মার দিচ্ছি।’

মার্কিন হামলার প্রতিক্রিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান।

জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা ইরানের চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে। একই সময়ে কুয়েতের সশস্ত্র বাহিনীও জানিয়েছে, দেশের আকাশসীমায় শত্রুভাবাপন্ন উড়ন্ত লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে দুই পক্ষের হামলা-পাল্টা হামলার মাত্রা ও পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

সেন্টকমের তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার রাতে ইরানের প্রায় ১৪০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়। এছাড়া চলতি সপ্তাহে টানা তিন রাতের অভিযানে ৩০০টির বেশি সামরিক অবস্থানে আঘাত হানার দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

এই নতুন সংঘাতের জেরে গত মাসে দুই দেশের মধ্যে হওয়া অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি কার্যত চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। তবে সেন্টকম জানিয়েছে, উত্তেজনার মধ্যেও কিছু বাণিজ্যিক জাহাজ এখনো হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে চলাচল করছে।

এর আগে রোববার কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকাশসীমা লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর প্রকাশিত হয়। কাতার, যা শান্তি আলোচনার অন্যতম মধ্যস্থতাকারী, সেখানে গত এপ্রিলের পর এটিই প্রথম হামলার ঘটনা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, মে মাসের পর এই প্রথম তারা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরানি ড্রোন প্রতিহত করেছে।

ইরানের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, হরমুজ প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী সিরিক, বন্দর আব্বাস এবং কুশেম দ্বীপে মার্কিন হামলায় একাধিক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে মার্কিন হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এই পদক্ষেপ পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে গত কয়েক মাসে নেওয়া সব কূটনৈতিক উদ্যোগকে ভেস্তে দিয়েছে। একই সঙ্গে তেহরানের অভিযোগ, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে হস্তক্ষেপ করে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে এবং পুরো অঞ্চলে নতুন করে অস্থিতিশীলতা বাড়াচ্ছে।

ইরান আরও জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি ও নৌপথ ব্যবস্থাপনা নিয়ে গত শনিবার ওমানের মাস্কাটে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় আলোচনা কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। তেহরানের অভিযোগ, এ ক্ষেত্রে ওমানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চাপ ছিল।

গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বর্তমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির কার্যকারিতা শেষ হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করলেও আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ করেননি। অন্যদিকে ইরানের শীর্ষ পরমাণু আলোচক মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘একতরফা চুক্তির দিন শেষ। আমরা আগেই বলেছিলাম—কথা রাখুন, না হলে মূল্য দিন। এখন বাস্তবতা দরজায় কড়া নাড়ছে।’

গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরান ও ইসরায়েলকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই বিশ্ববাজারে এর প্রভাব পড়তে শুরু করে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হয়েছে।

সোমবার (১৩ জুলাই) সকালে টোকিওতে লেনদেন শুরু হওয়ার পর অপরিশোধিত তেলের দাম সাড়ে তিন শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। মার্কিন ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৪ ডলারের ওপরে উঠে যায়।

এদিকে ইরান হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে স্থায়ীভাবে শুল্ক আদায়ের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ চলাচল না করার সতর্কতা দিয়েছে।

ইরানের নবগঠিত পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি দাবি করেছে, মার্কিন সামরিক তৎপরতার কারণে বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ নৌচলাচল সম্ভব নয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে নতুন করে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। ওয়াশিংটনের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে তাদের নৌবাহিনী প্রস্তুত রয়েছে এবং ওমান উপকূলসংলগ্ন সম্প্রসারিত দক্ষিণ রুট দিয়ে এখনো দুই দিকেই জাহাজ চলাচল অব্যাহত রয়েছে।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন