আন্তর্জাতিক

দোহায় দাফন করা হয়েছে আধুনিক কাতারের স্থপতি শেখ হামাদকে

বিশ্বব্যাপী প্রভাব বিস্তারকারী এক অতি-ধনী আধুনিক রাষ্ট্রে কাতারের অসাধারণ রূপান্তরের স্থপতি, ফাদার আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি ৭৪ বছর বয়সে মৃত্যুর পর দোহায় সমাহিত হয়েছেন।

রোববার (১২ জুলাই) সকালে তার মৃত্যুর খবর আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। একই দিন সূর্যাস্তের পর মাগরিবের নামাজ শেষে রাজধানী দোহার ইমাম মুহাম্মদ ইবন আবদুল ওয়াহাব মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

জানাজার সময় ঐতিহ্যবাহী কাতারি পোশাকে অসংখ্য শোকাহত মানুষ ইসলামী রীতি অনুযায়ী মরদেহের সামনে দাঁড়িয়ে দোয়ায় অংশ নেন। পরে তার ছেলে এবং বর্তমান আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে মরদেহ বহন করেন। এরপর দোহার উত্তরে লুসাইল কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

আল জাজিরার প্রতিবেদক জেইন বাসরাভি জানান, পুরো দাফন অনুষ্ঠান ছিল অত্যন্ত সাদামাটা। ইসলামী ঐতিহ্য অনুসরণ করে তাকে একটি সাধারণ কবরেই সমাহিত করা হয়েছে।

তার ভাষায়, এই সরল আয়োজন শেখ হামাদের ব্যক্তিত্বেরই প্রতিফলন। ব্যক্তিগত বিলাসিতার চেয়ে তিনি সবসময় দেশের জনগণের কল্যাণকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

১৯৯৫ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রায় আঠারো বছর কাতারের নেতৃত্ব দেন শেখ হামাদ। তার শাসনামলেই দেশটির অর্থনীতি অভূতপূর্ব গতিতে এগিয়ে যায়। বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুতকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও পরিকল্পনার ফলে কাতারের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ২৪ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পায়। ২০০৬ সালের মধ্যে কাতার বিশ্বের সবচেয়ে বড় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়।

অর্থনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও কাতারের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। বিভিন্ন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সংকটে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেশটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান উত্তেজনা প্রশমনের প্রচেষ্টাতেও কাতার সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।

শেখ হামাদের নেতৃত্বেই ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আল জাজিরা সংবাদমাধ্যম। অল্প সময়ের মধ্যেই এটি বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পরিণত হয়।

শেখ হামাদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন আল জাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্কের মহাপরিচালক শেখ নাসের বিন ফয়সাল আল থানি।

তিনি বলেন, আল জাজিরার মূল স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন শেখ হামাদ। তার দূরদর্শিতার ভিত্তিতেই এমন একটি গণমাধ্যমের জন্ম হয়, যা বিশ্বজুড়ে সত্য তুলে ধরা এবং প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়, বরং এটি একটি দায়িত্ব; আর স্বাধীন গণমাধ্যম মানুষের মৌলিক অধিকারের অন্যতম ভিত্তি।

তার শাসনামলে কাতারে রাজনৈতিক সংস্কারও এগিয়ে যায়। ২০০৪ সালে দেশটির প্রথম স্থায়ী সংবিধান কার্যকর হয়। একই সময়ে পৌরসভা নির্বাচন চালু করা হয়, যেখানে নারীরা ভোট দেওয়া এবং প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পান।

২০২২ সালে কাতার সফলভাবে পুরুষদের ফিফা বিশ্বকাপের আয়োজন করে। উদ্বোধনী ম্যাচে উপস্থিত দর্শকদের করতালির মাধ্যমে শেখ হামাদকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়, যা তার জনপ্রিয়তার আরেকটি প্রতীক হয়ে ওঠে।

২০১৩ সালে বিরল এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে শেখ হামাদ স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দেন। তখন মাত্র ৩৩ বছর বয়সী তার ছেলে শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির হাতে কাতারের নেতৃত্ব তুলে দেন তিনি। বংশানুক্রমিকভাবে শাসিত উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর ইতিহাসে এমন স্বেচ্ছায় ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘটনা খুবই বিরল।

কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবদুল্লাহ বান্দার আল-এতাইবি বলেন, শেখ হামাদ শুধু কাতারেই নয়, বিশ্বজুড়ে একটি স্থায়ী উত্তরাধিকার রেখে গেছেন। তার দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং বিশেষ করে এলএনজি খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ কাতারকে একটি সাধারণ রাষ্ট্র থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রভাবশালী ও সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করেছে। তার স্বপ্ন ও পরিকল্পনাই আধুনিক কাতারের ভিত্তি নির্মাণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন