খামেনির শেষযাত্রা শুধু শোক নয়, রয়েছে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বার্তা
ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা ও শেষযাত্রাকে ঘিরে সপ্তাহব্যাপী যে কর্মসূচি চলছে, সেটিকে কেবল একটি ধর্মীয় শোকানুষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রের আদর্শিক অবস্থান, রাজনৈতিক ঐক্য এবং প্রতিরোধের বার্তা তুলে ধরার বড় একটি আয়োজন হিসেবে ব্যবহার করছে তেহরান। রাষ্ট্রীয় প্রচারণা, প্রতীকী আয়োজন, ধর্মীয় বার্তা এবং জনসমাবেশ—সবকিছু মিলিয়ে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি সমর্থন আরও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে ইরানি কর্তৃপক্ষ।
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে ক্ষমতায় থাকা ইরানি সরকারের সমর্থকদের মধ্যে ঐক্যের বোধ জোরদার করতেই এই আয়োজনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাজধানী তেহরানে তিন দিনের শোক পালনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় খামেনির শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা। এরপর ইরান ও ইরাকের বিভিন্ন শহর ঘুরে তার মরদেহ নিয়ে শোকযাত্রা এগিয়ে চলছে। পুরো পথ ও আয়োজন শিয়া ইসলামের ইতিহাস এবং খামেনির রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে গভীর প্রতীকী অর্থ বহন করছে।
১৯৮৯ সাল থেকে সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব পালন করা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিমান হামলায় নিহত হন। এরপর মার্চ মাসে তার ছেলে আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

সরকারি প্রচারণায় খামেনির মৃত্যুকে বারবার ‘শাহাদাত’ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশকে জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও শোক সমাবেশে সরকারি স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘আমাদের জেগে উঠতেই হবে’। আন্তর্জাতিক ও আরবিভাষী দর্শকদের জন্য এর আরবি রূপ ‘আল্লাহর জন্য জেগে ওঠো’ ব্যবহার করছে কর্তৃপক্ষ। দুটি স্লোগানই কোরআনের একটি আয়াত থেকে অনুপ্রাণিত, যেখানে মুসলমানদের ঐশ্বরিক উদ্দেশ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
পুরো শোকানুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান প্রতীক হয়ে উঠেছে লাল ও কালো পটভূমিতে খামেনির মুষ্টিবদ্ধ হাতের ছবি। তার মৃত্যুর পর থেকেই এই প্রতীক রাষ্ট্রীয় প্রচারণায় ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির নামে প্রচারিত একটি বার্তা। নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি নিহত হওয়ার কিছু আগে, গত ১২ মার্চ প্রকাশিত সেই বার্তায় দাবি করা হয়, খামেনির মৃত্যুর সময় তার সুস্থ হাতটি শক্তভাবে মুষ্টিবদ্ধ অবস্থায় ছিল। উল্লেখ্য, ১৯৮১ সালের এক বোমা হামলায় গুরুতর আহত হওয়ার পর থেকেই খামেনি তার ডান হাতের কার্যক্ষমতা হারিয়েছিলেন।
নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির কারণে মোজতবা খামেনি এখনো জনসমক্ষে আসেননি। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, সম্ভাব্য গুপ্তহত্যার আশঙ্কায় তিনি বাবার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রকাশ্য অনুষ্ঠানগুলোতেও অংশ নিচ্ছেন না।

শোকানুষ্ঠানে লাল ও কালো রঙের ব্যাপক ব্যবহারও বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। ইরানি ব্যাখ্যায় কালো শোকের প্রতীক, আর লাল প্রতীক শাহাদাত ও প্রতিশোধের। রোববার এক বিবৃতিতে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ জানায়, খামেনিকে শেষ বিদায় জানাতে সমবেত লাখো মানুষ দুটি বার্তা উচ্চারণ করছেন—শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং শহীদ নেতার রক্তের প্রতিশোধ।
এই প্রতীকী বার্তাকে আরও জোরালো করতে তেহরানের বৃহত্তম ধর্মীয় প্রাঙ্গণ গ্র্যান্ড মোসাল্লায় উত্তোলন করা হয়েছে একটি বিশাল লাল পতাকা। শনিবার ও রোববার এই প্রাঙ্গণেই খামেনির মরদেহ সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়েছিল। পতাকায় আরবি ভাষায় লেখা রয়েছে ‘হে হুসাইনের প্রতিশোধকগণ’। এই বার্তার মাধ্যমে খামেনির হত্যাকাণ্ডকে কারবালার ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রায় ১ হাজার ৩০০ বছর আগে বর্তমান ইরাকের কারবালায় প্রথম উমাইয়া খলিফা মুআবিয়া প্রথমের বাহিনীর হাতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (আ.) শহীদ হন। বহু শিয়া মুসলমান উমাইয়া শাসনকে অবৈধ ও নিপীড়নমূলক শাসনের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করেন। সেই ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির মিল টেনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধকে ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। তবে ইরান কীভাবে সেই প্রতিশোধ নেবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট বার্তা দেয়নি।
এর আগে ২০২০ সালে মার্কিন বিমান হামলায় ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল কাসেম সোলেইমানি নিহত হলে ইরান ইরাকে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। যদিও ওই হামলায় কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। সে সময় তেহরান জানিয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন বাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে দেওয়াই তাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশোধের কৌশল।

খামেনির শেষযাত্রার পথও অত্যন্ত পরিকল্পিত ও প্রতীকসমৃদ্ধ। মরদেহ বহনকারী শোকযাত্রা তেহরান থেকে শুরু হয়ে পবিত্র নগরী কোম, এরপর ইরাকের নাজাফ ও কারবালা অতিক্রম করে সবশেষে মাশহাদে পৌঁছাবে। সেখানে ইমাম রেজা (আ.)–এর পবিত্র মাজারের পাশে তাকে দাফন করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পথ নির্বাচন কোনো কাকতালীয় সিদ্ধান্ত নয়। বরং এটি শিয়া ইসলামের ধর্মীয় কেন্দ্রগুলো এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের আদর্শিক ভিত্তিকে একই সূত্রে গেঁথে দেওয়ার একটি রাজনৈতিক বার্তা। প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির স্মৃতিবিজড়িত গ্র্যান্ড মোসাল্লা থেকে শেষযাত্রা শুরু করাও দুই নেতার আদর্শিক উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতা তুলে ধরার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শিয়া ধর্মতত্ত্ব ও ধর্মীয় বৈধতার অন্যতম কেন্দ্র কোম। এখান থেকেই পাহলভি রাজবংশের বিরুদ্ধে আন্দোলনের বড় অংশ সংগঠিত হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে রূপ নেয়। অন্যদিকে নাজাফ শিয়া ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্র, যেখানে প্রথম ইমাম আলী (আ.)–এর মাজার অবস্থিত। কারবালা ইমাম হুসাইন (আ.)–এর শাহাদাতের স্মৃতিবিজড়িত ভূমি, আর মাশহাদে রয়েছে অষ্টম ইমাম রেজা (আ.)–এর পবিত্র মাজার।
ফলে কোম, নাজাফ, কারবালা ও মাশহাদ ঘুরে খামেনির শেষযাত্রা শুধু একজন নেতার দাফন প্রক্রিয়াই নয়; বরং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের আদর্শিক ভিত্তি, শিয়া ধর্মীয় কর্তৃত্ব এবং গত পাঁচ দশক ধরে আন্তর্জাতিক পরিসরে শিয়া মতাদর্শ বিস্তারের রাজনৈতিক দর্শনেরও প্রতীকী সফরে পরিণত হয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা
এসি//