মেক্সিকান ‘দুর্গে’ তুমুল লড়াই, শেষ হাসি ইংল্যান্ডেরই!
বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরেই এমন কিছু ম্যাচ জন্ম দেয়, যেগুলো বছরের পর বছর ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থাকে। মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ড ও মেক্সিকোর মধ্যকার শেষ ষোলোর লড়াইও সেই তালিকায় জায়গা করে নেওয়ার জোর দাবি রাখে। শেষ বাঁশি বাজার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল—এটাই কি এবারের বিশ্বকাপের সেরা ম্যাচ?
নব্বই মিনিটেরও বেশি সময়জুড়ে দর্শকরা দেখেছেন ফুটবলের প্রায় সব রূপ। ছিল দুরন্ত আক্রমণ, চোখধাঁধানো পাল্টা আক্রমণ, ভিএআরের নাটকীয় সিদ্ধান্ত, লাল কার্ড, দুটি পেনাল্টি, গোলের রোমাঞ্চ আর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত টানটান উত্তেজনা। শেষ পর্যন্ত স্কোরবোর্ডে ৩–২ ব্যবধানে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে ইংল্যান্ড। তবে যারা পুরো ম্যাচ দেখেছেন, তাদের অনেকের কাছেই মনে হয়েছে—হেরে গিয়েও যেন জিতে গেছে মেক্সিকো।
কিন্তু ফুটবলে আবেগ নয়, শেষ পর্যন্ত ফলাফলই ইতিহাস লেখে। সেই ইতিহাসে নাম উঠেছে ইংল্যান্ডের। কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছে থমাস টুখেলের দল, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ নরওয়ে।
ম্যাচের প্রথমার্ধেই নিজের অসাধারণ নৈপুণ্যে আলো ছড়ান জুড বেলিংহাম। ছত্রিশ ও আটত্রিশ মিনিটে পরপর দুটি গোল করে ইংল্যান্ডকে দুই গোলের লিড এনে দেন রিয়াল মাদ্রিদের এই মিডফিল্ডার। বিশ্বকাপে চার ম্যাচ ধরে অপ্রতিরোধ্য থাকা মেক্সিকোর রক্ষণ প্রথমবারের মতো ভেঙে পড়ে এই ম্যাচেই। আরও বড় বিষয়, নিজেদের দুর্গ আজতেকা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ ইতিহাসে আগে কখনো হারেনি স্বাগতিকরা। তাই দুই গোলে পিছিয়ে পড়েও হাল ছাড়ার প্রশ্নই ছিল না।
সেই প্রত্যাবর্তনের সূচনা আসে বিয়াল্লিশতম মিনিটে। হুলিয়ান কিনিয়োনেস দুর্দান্ত এক গোল করে ব্যবধান কমিয়ে আনেন। গোলের পর মেক্সিকো যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায়। বিরতির আগে আরও অন্তত দুটি নিশ্চিত সুযোগ তৈরি করেছিল তারা। সেগুলো কাজে লাগাতে পারলে প্রথমার্ধের গল্পই অন্যরকম হতে পারত। কিন্তু সুযোগ নষ্টের মাশুল দিয়ে ২–১ ব্যবধানে পিছিয়েই ড্রেসিংরুমে যেতে হয় স্বাগতিকদের।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ম্যাচের মোড় ঘুরে যায়। চুয়ান্নতম মিনিটে হেসুস গায়ার্দোর ওপর বিপজ্জনক ট্যাকলের জন্য সরাসরি লাল কার্ড দেখেন ইংল্যান্ডের রাইটব্যাক জ্যারেল কোয়ানসা। দশজনের দলে পরিণত হওয়ার পর সবাই যখন মেক্সিকোর সমতায় ফেরার অপেক্ষায়, ঠিক তখনই ঘটে উল্টো ঘটনা।
ষাটতম মিনিটে বক্সের ভেতর অ্যান্থনি গর্ডনকে ফাউল করেন মেক্সিকোর গোলরক্ষক রাউল রানহেল। পেনাল্টি থেকে কোনো ভুল করেননি হ্যারি কেইন। ঠান্ডা মাথায় গোল করে ইংল্যান্ডকে আবার দুই গোলের নিরাপদ ব্যবধানে এগিয়ে দেন তিনি।
তবে নাটক তখনও শেষ হয়নি। মাত্র আট মিনিট পর নিজের বক্সেই ব্রায়ান গুতিয়েরেজকে ফাউল করে বসেন সেই কেইন। ভিএআরের সহায়তায় পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন রেফারি। স্পট কিক থেকে গোল করে ব্যবধান আবার এক গোলে নামিয়ে আনেন রাউল হিমিনেজ। এরপর যেন পুরো স্টেডিয়াম অপেক্ষা করছিল মেক্সিকোর সমতার গোল দেখার জন্য।
শেষ আধাঘণ্টায় কার্যত ইংল্যান্ডের বক্স ঘিরেই খেলেছে মেক্সিকো। হিমিনেজ, কিনিয়োনেস ও সতীর্থদের একের পর এক আক্রমণে ইংল্যান্ডের রক্ষণকে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়। কিন্তু নিকো ও’রাইলি, মার্ক গেহি, জন স্টোনস ও ড্যান বার্নরা অসাধারণ শৃঙ্খলায় সেই চাপ সামলে নেন। গোলবারের নিচে জর্ডান পিকফোর্ডও তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে দলকে ভরসা দেন।
পরিসংখ্যানও বলে দেয় ম্যাচে কতটা আধিপত্য ছিল মেক্সিকোর। বলের দখলে ছিল তাদের ৬৬ দশমিক ৮ শতাংশ। তারা মোট ২০টি শট নেয়, যার ৫টি ছিল লক্ষ্যে। ইংল্যান্ডের রক্ষণে বাধা পেয়ে বহু আক্রমণই কর্নারে পরিণত হয়। পুরো ম্যাচে মেক্সিকো কর্নার পায় ১২টি, যেখানে ইংল্যান্ড পায় মাত্র ২টি। অন্যদিকে ইংল্যান্ড সুযোগ তৈরি করেছে কম, কিন্তু ছিল অনেক বেশি কার্যকর। মাত্র ৬টি শট নিয়ে তার মধ্যে ৫টিই লক্ষ্যে রাখতে সক্ষম হয় তারা।
ম্যাচ শুরুর আগেও ছিল নাটকীয়তা। বজ্রঝড় ও প্রবল বৃষ্টির কারণে নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা পরে শুরু হয় খেলা। সেই বৃষ্টিভেজা রাতেই আজতেকা স্টেডিয়ামের চার দশকের পুরোনো এক দুঃস্বপ্নও মুছে ফেলে ইংল্যান্ড। উনিশশো ছিয়াশি বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে এই মাঠেই আর্জেন্টিনার কাছে ২–১ গোলে হেরেছিল তারা। দিয়েগো ম্যারাডোনার বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলের স্মৃতি এতদিন তাড়া করে ফিরেছিল ইংল্যান্ডকে। অবশেষে সেই স্টেডিয়ামেই নতুন এক সুখস্মৃতি লিখল থ্রি লায়ন্স।

ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ড শিবিরের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। মিক্সড জোনে কথা বলতে এসে হ্যারি কেইনের কণ্ঠ পর্যন্ত ভেঙে গিয়েছিল। সতীর্থদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ উদ্যাপনের ফলেই এমন হয়েছে বলে হাসিমুখে জানান তিনি। এবারের বিশ্বকাপে ইতোমধ্যে ছয় গোল করা ইংল্যান্ড অধিনায়কের চোখেমুখে তখন ছিল স্বস্তি আর আনন্দের ছাপ।
ইংল্যান্ডের কোচ থমাস টুখেলও জয়ের আনন্দের মধ্যেও প্রথমে প্রশংসা করেন প্রতিপক্ষকে। তাঁর ভাষায়, "পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, মেক্সিকো কখনো হাল ছাড়েনি। তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বাস ধরে রেখেছিল।"
নিজের দলের পারফরম্যান্স নিয়ে টুখেল বলেন, "এই রাতটি আমাদের মনে গেঁথে রাখা উচিত। এটা আজতেকা স্টেডিয়াম, প্রতিপক্ষ মেক্সিকো, আর ম্যাচটি ছিল অবিশ্বাস্য। প্রত্যেকে নিজেদের শতভাগ উজাড় করে দিয়েছে। এই অনুভূতিটা ধরে রেখেই আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে।"
শেষ বাঁশি বাজার পর ইংল্যান্ডের ফুটবলাররা যখন বিজয়ের উল্লাসে মেতে ওঠেন, তখন আজতেকার গ্যালারিজুড়ে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে মেক্সিকো সমর্থকদের কান্নার শব্দ। ফুটবল এমনই—এক দলের উৎসবই অন্য দলের হৃদয়ভাঙার গল্প হয়ে থাকে।
এসি//