আন্তর্জাতিক

খামেনির জানাজায় অংশগ্রহণকারীদের জন্য তৈরি হচ্ছে ৫ কোটি রুটি

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ বিদায় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। দেশটির কর্তৃপক্ষের ধারণা, এই আয়োজনে প্রায় ২ কোটি মানুষের সমাগম হতে পারে। সম্ভাব্য এই বিপুল জনসমাগম সামাল দিতে খাদ্য, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, পরিবহন ও আবাসনের ব্যাপক ব্যবস্থা করেছে ইরান।

ইরানের আধাসামরিক বাহিনী বাসিজ জানিয়েছে, শোকাহত মানুষের জন্য ১৬টি ভ্রাম্যমাণ বেকারির মাধ্যমে ৫ কোটি রুটি প্রস্তুতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অন্যান্য খাদ্য ও পানীয় সরবরাহের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রস্তুত রাখা হয়েছে ২ হাজার ৫০০টি অ্যাম্বুলেন্স। আকাশপথে নজরদারি ও জরুরি সহায়তার জন্য থাকবে ২১টি হেলিকপ্টার এবং ১০০টি ড্রোন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মানুষের অস্থায়ী আবাসনের জন্য ২০ হাজার শ্রেণিকক্ষ প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যেখানে বিশ্রাম ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থাও থাকবে।

বাসিজ আরও জানিয়েছে, তেহরানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। অনুষ্ঠান চলাকালে ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। জুলাই মাসের তীব্র গরমে মানুষের স্বস্তির জন্য ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লা কমপ্লেক্স এলাকায় ৬ হাজারের বেশি পানির স্প্রিঙ্কলার স্থাপন করা হয়েছে।

ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিদায় অনুষ্ঠান আয়োজনই তাদের লক্ষ্য।

তিনি বলেন, এই আয়োজনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের স্থিতিশীলতা ও প্রতিরোধের সক্ষমতার বার্তা পৌঁছে দেওয়া হবে। তবে এত বড় আয়োজনের কারণে তেহরানের বাসিন্দারা তীব্র যানজট ও জ্বালানি সংকটের মতো সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন।

গত শুক্রবার (০২ জুলাই) রাজধানী তেহরানে আনুষ্ঠানিকভাবে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শোক ও দাফন কর্মসূচি শুরু হয়েছে। আগামী সাত দিন ইরান ও ইরাকের বিভিন্ন শহরে শোকযাত্রা এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান চলবে। শুক্রবারই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা তেহরানে গিয়ে তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান।

শনিবার (০৩ জুলাই) সকাল থেকেই তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লার বাইরে লাখো মানুষ শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সারিবদ্ধভাবে অপেক্ষা করছেন। জানাজায় অংশ নিতে তেহরানের মেট্রো স্টেশনগুলোতেও ছিল মানুষের উপচে পড়া ভিড়। ভোর থেকেই অসংখ্য মানুষ দ্রুতগামী এই গণপরিবহন চালু হওয়ার অপেক্ষায় স্টেশনগুলোতে জড়ো হন।

ইরানের বার্তা সংস্থা আইএসএনএ প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, কালো পোশাক পরা শত শত শোকার্ত মানুষ বন্ধ মেট্রো স্টেশনের প্রবেশপথে অপেক্ষা করছেন। গেট খোলার পর প্রতিটি ট্রেনে ছিল ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি যাত্রী।

এর আগে চলতি বছরের মার্চ মাসে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে দাফনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় সেই সূচি পরিবর্তন করা হয়।

খামেনির শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরাও অংশ নিয়েছেন। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছে। এছাড়া পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রহমান, জর্জিয়ার প্রেসিডেন্ট মিখেইল কাভেলাশভিলি, আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান, তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেভদেত ইয়িলমাজ এবং রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়া ভারতের বিহারের গভর্নর সৈয়দ আতা হাসনাইন, ভারতের কেন্দ্রীয় উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্গারিটা, চীনের জাতীয় গণকংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির সহসভাপতি হে ওয়েই, আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি, ফিলিস্তিনের হামাস এবং লেবাননের হিজবুল্লাহর প্রতিনিধিরাও শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।

তবে, নিরাপত্তাজনিত কারণে ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা এবং খামেনির ছেলে মোজতবা আলী খামেনি এই শোক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকছেন না। সম্প্রতি তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। সেই নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণেই তাঁকে জনসমক্ষে না আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, গেল ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ৮৬ বছর বয়সে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। ওই দিন থেকেই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরাইলের সামরিক অভিযান শুরু হয়। পরে যুদ্ধ শুরুর ৪০ দিনের মাথায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। এরপর ১৭ জুন দুই দেশ একটি সমঝোতা স্মারকে সই করে। বর্তমানে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় স্থায়ী শান্তিচুক্তির লক্ষ্যে আলোচনা চলছে।

সূত্র: সিএনএন, আলজাজিরা

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন