ব্যক্তিনির্ভর নয়, প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে গেছেন খামেনি
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শুধু একজন নেতার শেষ বিদায় নয়, বরং চার দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটির রাজনীতি, নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে প্রভাবিত করা একটি যুগের সমাপ্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজধানী তেহরানে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে শুরু হওয়া এই শোকানুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
তেহরানের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ–এর গবেষক আলী আকবর দারেইনি আল জাজিরাকে বলেন, খামেনি এমন একটি স্থিতিস্থাপক রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তুলেছিলেন, যা কোনো একক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। তার ভাষায়, এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের প্রথম দিনেই সর্বোচ্চ নেতা এবং শীর্ষ সামরিক কমান্ডাররা নিহত হওয়ার পরও ইরানের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। দারেইনির মতে, এটিই খামেনির সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি।
১৯৮৯ সালে ইরাকের সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধ শেষে পুনর্গঠনের সময় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। এরপর চার দশকের বেশি সময় ধরে তার কার্যালয় সশস্ত্র বাহিনী, বিচার বিভাগ, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এবং গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত নিয়োগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

তার নেতৃত্বে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড করপস (আইআরজিসি) দেশটির নিরাপত্তা, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে অন্যতম প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। একই সময়ে ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিও সম্প্রসারণ করে, যা দেশটি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সক্ষমতার অংশ হিসেবে তুলে ধরে।
খামেনির পারমাণবিক নীতিও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তিনি বারবার দাবি করেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না। তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার থেকে সরে আসতে তিনি কখনোই রাজি হননি। তার আঞ্চলিক কৌশলও ছিল মিত্র সরকার ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা, যা একদিকে ইরানের প্রভাব বাড়ালেও অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তোলে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির মৃত্যু রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে দুর্বল করার পরিবর্তে অনেক ইরানির মধ্যে ঐক্যের অনুভূতি আরও জোরালো করেছে। সেই চিত্রই ফুটে উঠেছে তার রাষ্ট্রীয় বিদায় অনুষ্ঠানে।

ইরানি কর্তৃপক্ষের আশা, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নিতে এক কোটিরও বেশি মানুষ তেহরানে সমবেত হতে পারেন। আনুষ্ঠানিকতা শুরুর অনেক আগেই হাজারো মানুষ রাজধানীর প্রার্থনা হল ও অনুষ্ঠানস্থলের বাইরে অবস্থান নেন। অনেকে রাতভর অপেক্ষা করেন, শুধু প্রিয় নেতাকে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে।
অপেক্ষমাণদের একজন সোমায়ে বলেন, “আমরা আমাদের নেতার প্রতি ভালোবাসার টানেই এসেছি। এই অপেক্ষা মধুর হলেও তিক্ত।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাতেমা বলেন, “তিনি দেশের জন্য যা করেছেন, তার তুলনায় এই অপেক্ষা কিছুই নয়। তাকে বিদায় জানাতে আমাদের কোনো চেষ্টাই বাকি রাখা উচিত নয়।”

আরেক শিক্ষার্থী মাহদির ভাষায়, “১০ থেকে ১২ ঘণ্টা অপেক্ষা করাও কোনো বিষয় নয়। এটি যেন নিজের পরিবারের একজনকে শেষ বিদায় জানানোর মতো।”
রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় আয়োজিত এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া তাই শুধু একজন নেতার শেষযাত্রা নয়; এটি ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাস, রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।