আন্তর্জাতিক

‘তেলাপোকা’ দল নিয়ে নতুন চাপে মোদি সরকার

রাজনীতিতে সাধারণত মানুষ বাঘ, সিংহ কিংবা পদ্ম-হাতির মতো প্রতীক বেছে নেয়। কিন্তু ভারতের একদল ক্ষুব্ধ তরুণ নিজেদের পরিচয় দিচ্ছেন ‘তেলাপোকা’ হিসেবে। নাম দিয়েছেন—ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। মাসখানেক আগেও যে দলের কোনো অস্তিত্ব ছিল না, সেই দলই এখন হাজারো তরুণকে রাস্তায় নামিয়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, বেকারত্ব ও সরকারি নীতির বিরুদ্ধে নতুন ধরনের প্রতিবাদের মুখ হয়ে উঠছে।

মধ্যপ্রদেশের একটি গ্রাম থেকে ১৭ বছর বয়সী সৌরভ কুশাওয়াহা শুধু এই আন্দোলনে অংশ নিতে নয়াদিল্লিতে এসেছিলেন। শনিবার (০৬ জুন) তাকে ও তার ভাইকে বিক্ষোভস্থলের কাছে ফুটপাতে বসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা আন্দোলনের মুখপাত্র অভিজিৎ দীপকের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা যায়।

ভারতের তরুণ সমাজের মধ্যে প্রশ্নফাঁস, বোর্ড পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে ত্রুটি, চাকরির সংকট এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ বাড়ছে। দেশটির ১৪০ কোটির বেশি মানুষের প্রায় অর্ধেকের বয়স ২৫ বছরের নিচে। এদের বড় একটি অংশ কখনো বিজেপি ছাড়া অন্য কোনো কেন্দ্রীয় সরকার দেখেনি।

সমালোচকদের মতে, বিজেপি সরকার ধীরে ধীরে ভিন্নমতকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করছে। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিভিন্ন গণতন্ত্র সূচকে ভারতের অবস্থানও পিছিয়েছে। একই সঙ্গে বেকারত্ব বেড়েছে এবং অনেক তরুণ কম বেতনের চাকরি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

এই প্রেক্ষাপটে ককরোচ জনতা পার্টির ব্যানারে একত্রিত হয়েছেন অসংখ্য তরুণ। শনিবার যন্তর মন্তরে আয়োজিত বিক্ষোভে অভিজিৎ দীপকে ও শত শত আন্দোলনকারী এক দফা দাবি উত্থাপন করেন—শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে।

সমাবেশে দীপকে বলেন, “মোদি সরকারের প্রতি আমাদের হুঁশিয়ারি—শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য করুন। তা না হলে আমরা এখান থেকে সরব না।”

বিক্ষোভের পরও আন্দোলনকারীরা তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছেন। সিজেপি ঘোষণা দিয়েছে, আগামী সাত দিনের মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করলে বা তাকে অপসারণ করা না হলে দেশব্যাপী আন্দোলন শুরু হবে।

রোববার (০৭ জুন) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে দীপকে লেখেন, “গতকাল হাজারো মানুষ ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। যন্তর মন্তরের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ সরকারকে দেখিয়ে দিয়েছে, তেলাপোকারা এক হলে কী ঘটতে পারে।”

বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলনের সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দেখা জেন-জি আন্দোলনের মিল রয়েছে। বাংলাদেশ ও নেপালে তরুণদের নেতৃত্বে হওয়া আন্দোলন রাজনৈতিক পরিবর্তনের বড় কারণ হয়েছিল।

তবে ভারতের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে বিজেপি তাদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে। পশ্চিমবঙ্গেও ক্ষমতায় এসেছে দলটি এবং উত্তর ও পশ্চিম ভারতের বাইরে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে ভারতের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ রাজ্য মোদি ও তার রাজনৈতিক মিত্রদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

তবু নতুন এই তরুণ আন্দোলন মোদি সরকারের জন্য দীর্ঘমেয়াদে চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। যদিও এটি রাতারাতি সরকারের পতন ঘটাবে না, তবে ক্ষমতার ভিত্তিকে দুর্বল করে দেওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।

মার্কিন বাণিজ্য সাময়িকী ব্লুমবার্গের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভারতের রাজনীতির ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ধারণ করছেন জেন-জি ভোটাররা। তরুণদের মধ্যে কোনো রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে অসন্তোষ তৈরি হলে তা নির্বাচনী সমীকরণ বদলে দিতে পারে।

ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৫ শতাংশের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও তরুণ প্রজন্মের বয়স, অভিজ্ঞতা এবং চিন্তার ব্যবধানও ক্রমশ বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বাস্তবতাই আগামী দিনের ভারতীয় রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

 

সূত্র: এনডিটিভি

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন