লাইফস্টাইল

অতিরিক্ত দিবাস্বপ্ন: স্বাভাবিক কল্পনা নাকি মানসিক রোগের ইঙ্গিত?

একটা সাধারণ বিকেল। কেউ জানালার পাশে বসে আছে, কেউ আবার রাস্তা ধরে হাঁটছে, কেউ হয়তো গান শুনছে। বাইরে থেকে দেখলে তারা একদমই স্বাভাবিক। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তাদের মাথার ভেতর তখন চলছে আরেকটা জীবন—একটা পূর্ণাঙ্গ কল্পনার পৃথিবী, যেখানে তারা কখনও নায়ক, কখনও ভালোবাসার কেন্দ্র, কখনও আবার একেবারে অন্য কেউ। এই অভিজ্ঞতাই অনেকের ক্ষেত্রে রূপ নেয় এক বিশেষ মানসিক অবস্থায়, যাকে বলা হয় “ম্যালঅ্যাডাপটিভ ডে-ড্রিমিং” বা অতিরিক্ত দিবাস্বপ্ন। এখানে স্বপ্ন দেখা আর শুধু কল্পনা থাকে না—এটা হয়ে ওঠে দীর্ঘ সময়ের একটি অভ্যন্তরীণ জগৎ, যা বাস্তব জীবনের সমান বা কখনও তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হতে শুরু করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ দিবাস্বপ্ন মানুষের জীবনের স্বাভাবিক অংশ। আমরা জেগে থাকা অবস্থার বড় একটা সময়ই বাস্তবের বাইরে চিন্তা করি। এটা আমাদের কল্পনাশক্তি বাড়ায়, অনুভূতি বুঝতে সাহায্য করে, এমনকি মনকেও কিছুটা হালকা করে। কিন্তু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই স্বপ্ন ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ হারায়। শুরুটা অনেক সময় খুবই সাধারণ। একাকীত্ব, চাপ, বা ছোটবেলার কোনো কষ্ট থেকে কেউ কেউ নিজের ভেতরেই একটা “নিরাপদ জগৎ” তৈরি করে ফেলে। সেখানে কেউ তাদের কষ্ট দেয় না, সেখানে তারা সম্মান পায়, ভালোবাসা পায়, আর সবকিছু নিজের ইচ্ছেমতো চলে। সমস্যা হয় তখন, যখন এই জগৎ বাস্তবের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে এই কল্পনার জগৎ এতটাই শক্তিশালী হয়ে যায় যে মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাতে ডুবে থাকে।

গবেষণা বলছে, কিছু ক্ষেত্রে এটি দিনে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্তও চলতে পারে। গল্পগুলো শুধু একদিনের নয়—বছরের পর বছর, এমনকি দশক ধরে একই কাহিনি ঘুরতে থাকে মাথার ভেতর। বাইরে থেকে বিষয়টি বোঝা কঠিন। কারণ এটি কোনো দৃশ্যমান অসুখ নয়। কিন্তু ভেতরে ভেতরে এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে। পড়াশোনা, কাজ, সম্পর্ক—সবকিছু পিছিয়ে পড়ে, কারণ বাস্তব জীবনের চেয়ে কল্পনার জীবন অনেক বেশি “নিখুঁত” মনে হয়।

অনেকেই বলেন, এই কল্পনার জগৎ একধরনের নেশার মতো। গান শোনা, একা থাকা, বা বারবার একই ধরনের শারীরিক নড়াচড়া—যেমন হাঁটা বা পেসিং—এই অবস্থাকে আরও গভীর করে তোলে। ফলে মানুষ ধীরে ধীরে সামাজিক জীবন থেকেও দূরে সরে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে থাকতে পারে শৈশবের একাকীত্ব, মানসিক আঘাত, অবহেলা বা দীর্ঘদিনের চাপ। অনেক সময় এডিএইচডি (ADHD), ওসিডি (OCD), বিষণ্নতা বা উদ্বেগের সঙ্গেও এর সম্পর্ক পাওয়া যায়। তবে এটি একেকজনের ক্ষেত্রে একেকভাবে কাজ করে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই অবস্থাকে পুরোপুরি কল্পনা বন্ধ করার সমস্যা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বরং এটি অনেক সময় একটি মানসিক “পালানোর পথ” হিসেবে শুরু হয়। বাস্তবের কষ্ট থেকে বাঁচতে মানুষ কল্পনার আশ্রয় নেয়। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন এই আশ্রয়ই জীবনের মূল জায়গা দখল করে নেয়। ভালো খবর হলো, এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

প্রথম ধাপ হলো নিজের সময়ের হিসাব রাখা—কতক্ষণ মানুষ কল্পনায় হারিয়ে যাচ্ছে তা বোঝা। এরপর ধীরে ধীরে সেই সময়কে বাস্তব কাজ, নতুন অভ্যাস বা মনোযোগ ধরে রাখার কাজে ব্যবহার করা। অনেকেই আবার এই অভ্যাসকে সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেন না, বরং নতুনভাবে ব্যবহার করতে শেখেন—লেখালেখি, গল্প তৈরি বা সৃজনশীল কাজে। এতে কল্পনা আর বাস্তবের মধ্যে একটা ভারসাম্য তৈরি হয়।

তবে বিশেষজ্ঞরা একটি সহজ কথা বলেন, কল্পনা নিজে কোনো শত্রু নয়। শত্রু তখনই হয়, যখন কল্পনা মানুষকে বাস্তব জীবন থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। কারণ তখন মানুষ বেঁচে থাকে নিজের তৈরি গল্পে—আর হারিয়ে ফেলে নিজের সত্যিকারের জীবন।

সূত্র: বিবিসি

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন