ভিএআরে হারাল গোল, সিয়াটলের লকার রুমে ইরানের ‘ইঙ্গিতপূর্ণ’ চিঠি
ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, কখনো কখনো এটি হয়ে ওঠে মানুষের অনুভূতি, সম্মান আর বার্তা প্রকাশের এক শক্তিশালী মাধ্যম। মাঠে জয়-পরাজয়ের লড়াই শেষ হলেও কিছু মুহূর্ত থেকে যায়, যা স্কোরলাইনের বাইরেও মানুষের মনে জায়গা করে নেয়। তেমনই এক ঘটনা ঘটেছে চলমান বিশ্বকাপে ইরান ফুটবল দলের সঙ্গে।
গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে মিশরের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় জয় হাতছাড়া হয় ইরানের। ভিএআরের সিদ্ধান্তে গোল বাতিল হওয়ার পরও সিয়াটলের লকার রুমে প্রতিপক্ষ ও ফুটবল বিশ্বের জন্য একটি বিশেষ বার্তা রেখে যায় ইরান দল। হাতে লেখা সেই চিঠি পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
মিশরের বিপক্ষে ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র করে গ্রুপপর্ব শেষ করে ইরান। ম্যাচের শেষ দিকে শোজা খলিলজাদেহের করা গোলটি ভিএআরের মাধ্যমে অফসাইডের কারণে বাতিল হয়। ফলে সম্ভাব্য জয় থেকে বঞ্চিত হয় তারা।
অন্যদিকে এই ড্রয়ের সুবাদে মিশর গ্রুপের দ্বিতীয় দল হিসেবে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করে। একই সময়ে নিউজিল্যান্ডকে ৫-১ গোলে হারিয়ে গোল ব্যবধানে শীর্ষে উঠে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয় বেলজিয়াম। তৃতীয় স্থানে থাকা ইরানের পরবর্তী রাউন্ডে যাওয়ার আশা এখন নির্ভর করছে অন্য গ্রুপগুলোর ফলাফলের ওপর।

তবে মাঠের হিসাব-নিকাশের বাইরে আলোচনায় এসেছে ইরান দলের অন্য এক পরিচয়। রাজনৈতিক উত্তেজনার কঠিন সময়ে প্রতিটি ম্যাচ শেষে তাদের মেক্সিকোর তিজুয়ানায় অবস্থিত ক্যাম্পে ফিরে যেতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও সিয়াটলের লকার রুমে তারা রেখে গেছে শান্তি ও সম্মানের এক বার্তা।
মিশরের বিপক্ষে ম্যাচ চলার সময়ই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা নতুন করে আলোচনায় আসে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের রাডার, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে সিয়াটলের লকার রুমে ইরান দল যে চিঠি রেখে যায়, তাতে লেখা ছিল—
‘আমরা ইরান থেকে এসেছি—এমন এক ভূমি থেকে, যা হাজার বছর ধরে বিজয়ের চেয়েও সম্মানকে সবার ওপরে স্থান দিয়েছে। আমাদের কাছে ফুটবল কেবল ফলাফলের প্রতিযোগিতা নয়, এটি চরিত্রের পরীক্ষা। পয়েন্ট নানা উপায়ে অর্জন করা যায়, কিন্তু সম্মান ও শ্রদ্ধা এভাবে পাওয়া যায় না। যে কেউ গ্রুপপর্ব পার হতে পারে, কিন্তু সততা ও সম্মান নিয়েই ইতিহাসের সামনে দাঁড়ানো যায়। ফেয়ার প্লে কেবল নিয়মের অংশ নয়, এটি এই খেলার আত্মা। সিয়াটল, আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ। আর ধন্যবাদ সেই সব ইরানিকে, যারা হৃদয় ও কণ্ঠ দিয়ে আমাদের সমর্থন করেছেন। ইরান সবসময় মাথা উঁচু করে থাকবে।’

এর আগে বেলজিয়ামের সঙ্গে গোলশূন্য ড্রয়ের পর লস অ্যাঞ্জেলেসের ড্রেসিংরুমেও একই ধরনের একটি বার্তা রেখে গিয়েছিল ইরান দল।
সেই চিঠিতে তাদের হাজার বছরের প্রাচীন পারস্য সভ্যতার গৌরবময় ইতিহাসের কথা টেনে বলা হয়েছিল, ‘হাজার বছর আগের প্রাচীন পারস্য থেকে আজকের সভ্য ইরান; ইরানের আত্মা চিরকাল জীবিত ও অবিচল। আমরা লস অ্যাঞ্জেলেসে গর্বের সঙ্গে এসেছি, সম্মানের সঙ্গে লড়েছি এবং মর্যাদার সঙ্গে বিদায় নিচ্ছি। আতিথেয়তার জন্য লস অ্যাঞ্জেলেসকে ধন্যবাদ। সেই সঙ্গে ধন্যবাদ প্রতিটি ইরানিকে, যারা এই ১৮০ মিনিটে ইরানের জন্য নিজেদের কণ্ঠ ও আত্মা সঁপে দিয়েছেন। পৃথিবীর সব জাতির মধ্যে শান্তি, শ্রদ্ধা এবং বন্ধুত্ব বজায় থাকুক।’
যুদ্ধের উত্তেজনা, রাজনৈতিক চাপ আর মাঠের কঠিন লড়াই—সবকিছুর মাঝেও ইরান দলের সেই ছোট্ট চিঠি মনে করিয়ে দিয়েছে, ফুটবল মানুষের মধ্যে দূরত্ব কমানোর এক মাধ্যমও হতে পারে।
একটি ম্যাচের ফল হয়তো কয়েক ঘণ্টা পর ভুলে যাবে মানুষ, কিন্তু প্রতিপক্ষের লকার রুমে রেখে যাওয়া একটি মানবিক বার্তা অনেক সময় ইতিহাসে থেকে যায়।
এসি//